রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কেন স্বচ্ছ নয় এবং স্থানীয়দের কাছে উন্মুক্ত নয়?
স্থানীয় বা কক্সবাজারের এনজিও নেতারা ফান্ডের আশায় জাতিসংঘ এবং আইএনজিওগুলোর সাথে সম্পর্ক রাখাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, যার বিনিময়ে তারা স্থানীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিচ্ছেন
গত তিন-চার মাস ধরে ঢাকা এবং কক্সবাজার উভয় স্থানেই গুঞ্জন রয়েছে যে, জাতিসংঘ সংস্থাগুলো এবং বিভিন্ন উন্নত দেশ সরকারকে ক্যাম্পে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য স্থায়ী বা আধা-স্থায়ী ঘর তৈরির অনুমতি দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। যেহেতু নতুন সরকার শপথ নিয়েছে এবং বর্তমানে তথাকথিত 'পশ্চিম-বান্ধব' পররাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করছেন, তাই তারা এই প্রারম্ভিক সময়েই বিষয়টি সামনে নিয়ে আসছে।
এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব গত সপ্তাহের শেষ দিকে (২৩ থেকে ২৫ এপ্রিল) কক্সবাজার সফর করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাথে কথা বলেছেন।
আমরা, কোষ্ট ফাউন্ডেশন এবং সিসিএনএফ (আমাদের ওয়েবসাইটে এই সংক্রান্ত রিপোর্টগুলো পাবেন) ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় রোহিঙ্গাদের জন্য প্রি-ফেব্রিকেটেড দোতলা ঘরের প্রস্তাব দিয়ে প্রচারণা চালিয়ে আসছি। প্রি-ফেব্রিকেটেড মানে হলো, লোহা এবং কাঠের কাঠামোর ফ্রেম কারখানায় তৈরি হবে এবং পরে ক্যাম্পে স্থাপন করা হবে; পরবর্তীতে যখন রোহিঙ্গারা দেশ ছেড়ে চলে যাবে, তখন সেই কাঠামো সহজেই খুলে ফেলা যাবে। কোনো অবস্থাতেই ক্যাম্প এলাকায় কোনো 'পাকা' বা কংক্রিটের কাঠামো নির্মাণ করা উচিত নয়।
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিতে গিয়ে কক্সবাজার ইতিমধ্যে প্রায় ৮০০ থেকে ৮০০০ একর বনভূমি ও আবাদি জমি হারিয়েছে। উল্লেখ্য যে, এই বন উখিয়া-টেকনাফের মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎস। এছাড়া ক্যাম্পের বর্জ্যের কারণে প্রায় ৩০০ একর জমি এখন চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্তমানে কক্সবাজার দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার জেলা।
যেকোনো স্থায়ী বা আধা-স্থায়ী স্থাপনা কেবল স্থানীয় মানুষের জীবিকাকেই সংকটাপন্ন করবে না, বরং এটি মিয়ানমার এবং রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কাছে একটি ভুল বার্তা দেবে, যা আমাদের প্রত্যাবাসন আলোচনার প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। জাতিসংঘ সংস্থাগুলো যুক্তি দিচ্ছে যে, রোহিঙ্গারা খুব ঘিঞ্জি জায়গায় বাস করছে (প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ)। কিন্তু শুধু ঢাকা শহরের মোহাম্মদপুর এলাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৯০ হাজার মানুষ বাস করে; আবার আমার জন্মস্থান কুতুবদিয়া দ্বীপে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৭ থেকে ১০ হাজার মানুষ বাস করছে।
স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কোষ্ট ফাউন্ডেশন এবং সিসিএনএফ কক্সবাজারে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ সচিবের সাথে একটি বৈঠকে অংশ নিতে চেয়েছিল, কিন্তু আয়োজক কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করে। বলা হয়েছে যে, শুধুমাত্র 'শেল্টার সেক্টর কমিটি'র সদস্যদের সেখানে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া হবে। এই কমিটির সদস্য হলো ৭টি আইএনজিও, ২টি জাতিসংঘ সংস্থা (UNHCR ও IOM), ব্র্যাক, আমান এবং এনজিও ফোরাম। এই তিনটি সংস্থা—ব্র্যাক, আমান এবং এনজিও ফোরামের স্থানীয়দের পক্ষে কথা বলার কোনো পূর্ব রেকর্ড নেই। অনেক আগে জাতিসংঘ এবং আইএসসিজি কর্মকর্তাদের সাথে এক বৈঠকে আমি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কক্সবাজার সফরের সময় স্থানীয় এনজিও নেতাদের অংশগ্রহণের বিষয়টি উত্থাপন করেছিলাম, যাতে আমরা স্থানীয় সমস্যাগুলো তুলে ধরতে পারি। আইএসসিজি (বর্তমানে যা রোহিঙ্গা রেসপন্স কোঅর্ডিনেশন টিম) কর্মকর্তারা কূটনৈতিকভাবে আমার উদ্বেগের বিষয়টি এড়িয়ে গিয়েছিলেন।
গত তিন-চার দিন ধরে আমি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে (যেখানে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো আলোচনা করে) এই বিষয়টি লিখছি, কিন্তু বিড়ম্বনার বিষয় হলো, কোনো এনজিও নেতাই আমার মতামতকে তেমন সমর্থন করেননি। আমি এটি দেখে বিস্মিত যে, আমাদের স্থানীয় বা কক্সবাজারের এনজিও নেতারা ফান্ডের আশায় জাতিসংঘ এবং আইএনজিওগুলোর সাথে সম্পর্ক রাখাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন, যার বিনিময়ে তারা স্থানীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিচ্ছেন।
শুধু এইবারই নয়, এমনকি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের রোহিঙ্গা সম্মেলন বা প্রতি বছর ডিসেম্বরে ব্যাংককে 'রিজিওনাল হিউম্যানিটেরিয়ান পার্টনারশিপ উইক'-এর প্রাক্কালে রোহিঙ্গাদের অধিকারের বিষয়গুলো তুলে ধরার জন্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। আমি অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলছি যে, জাতিসংঘ সংস্থাগুলো কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের 'উদ্বাস্তু' হিসেবেই রেখে দিতে চায় যাতে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ত্রাণের ব্যবসা চালু থাকে, যা কোনোভাবে তাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য "রিফিউজি ট্যুরিজম" বা "উদ্বাস্তু পর্যটন" হিসেবে কাজ করছে। আমি মনে করি, রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিক অধিকার ও মাতৃভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য 'মুক্তিযোদ্ধা' হিসেবে উৎসাহিত করা উচিত। অথচ সংস্থাগুলো মিয়ানমার জান্তার রোহিঙ্গা গণহত্যার জবাবদিহিতা কিংবা বর্তমানে আরাকান আর্মির প্রভাব নিয়ে খুব কমই কথা বলে। ক্যাম্পে কর্মরত প্রায় ৬০টি আন্তর্জাতিক এনজিও এই বিষয়ে কোনো অবস্থান নেয় না। এমনকি জেলা প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে একটি বৈঠকে একটি আন্তর্জাতিক এনজিও ক্যাম্পে 'স্টেডিয়াম' তৈরির প্রস্তাব দেওয়ার সাহস দেখিয়েছে; এই আইএনজিওটি কক্সবাজারে অন্তত তিনটি জাতিসংঘ সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত হয়।
আমাদের কখনোই মাথা নত করা উচিত নয় বা স্থানীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। সারাবিশ্বে বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় ৮০ শতাংশ শরণার্থী তাবু বা অস্থায়ী আশ্রয়ে বাস করছে। আমাদের নতুন নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা রয়েছেন, রেসপন্স ম্যানেজমেন্ট বা ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় অবশ্যই তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ত্রাণ ব্যবস্থাপনাকে বিদেশিদের জন্য কোনো 'সুখের দ্বীপ' হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
Shamiur Rahman
