অপ্রতিরোধ্য সহকারী পরিচালক ড. সাফায়েত আলম

নায়েমের প্রতিটি স্তরে ব্যাপক দূর্নীতির অভিযোগ

Published: 15 November 2021 07:11

২০১৭ সালে সহকারী পরিচাল ড. সাফায়েত আলম নায়েমে যোগদান করেন। অত্যন্ত সুচতুর এই কর্মকর্তা তৎকালীন ডিজি ও পরিচালক, প্রশাসন ও অর্থ; এর দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অল্পদিনের মধ্যে নায়েমের সমস্ত কেনাকাটা তিনি নিজ হেফাজতে নেন

জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) এর কেনাকাটার প্রতিটি ধাপে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

২০১৭ -১৮ অর্থ বছরে ১৭,১০,০০০/- (সতের লক্ষ দশ হাজার) টাকায় প্রতিষ্ঠানটি ক্রয় করেছে মাত্র চারটি টেলিভিশন। যে চারটি টেলিভিশনের দাম সতের লক্ষ দশ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে; বাজারে তার সর্বোচ্চ মূল্য মাত্র সাত লাখ টাকা।

একই সাথে প্রতি বছর নায়েমে ৩/৪ হাজার প্রশিক্ষণ ব্যাগ ক্রয় করা হয়। প্রতিটি ব্যাগের দাম দেখানো ১০০০-১২০০ টাকা, কিন্তু সরবরাহকারীর সূত্র থেকে জানা যাচ্ছে প্রতিটি ব্যাগের সর্বোচ্চ মূল্য ৩০০ টাকা ।

এ ছাড়া ৩,৪৯,৫১০/- (তিনলক্ষ উনপঞ্চাশ হাজার পাচশত দশ) টাকার খেলাধুলার সামগ্রী ক্রয় দেখানো হলেও সে সব দ্রব্যের কোন অস্তিত্ব নায়েমে নেই। প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত একাধিক সূত্র বলছে এসব পণ্য না কিনেই বিল দেখানো হয়েছে।

এদিকে অন্য একটি ক্রয় প্রক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে, ৩৬,৩০,২৪১/-(ছত্রিশ লক্ষ ত্রিশ হাজার দুইশত একচল্লিশ) টাকার প্রশিক্ষন সামগ্রী ক্রয় করা হয়েছে যার মাত্র চার ভাগের এক ভাগ নায়েমে পৌঁছেছে।

পাঁচটি ৫ টনি এসি (জেনারেল কোম্পানির) কেনা হয়েছে যার সবগুলোই পরিচিত ঠিকাদারের সাথে আতাত করে অল্প দামে কিনে অনেক বেশি মূল্য দেখানো হয়েছে।

অনেক ফটোকপিয়ার ও এসি মেরামত না করে কৌশলে নষ্ট দেখিয়ে নতুন করে কেনা হয়েছে ও একই এসি বারবার মেরামত করে অনেক টাকা বিল দাখিল করা হয়েছে।

এমন বিস্তর অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। এ সকল অনৈতিক ও দূর্নীতির সাথে যার নাম সবচেয়ে বেশী আলোচনায় আসছে তিনি হচ্ছেন ড. সাফায়েত আলম।

নায়েমের সাথে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, ড. সাফায়েত যোগদানের পর নানা কৌশলে নায়েমকে তিনি দূর্নীতির আখড়ায় পরিনত করেছেন।

জানা যায়, ২০১৭ সালে সহকারী পরিচাল ড. সাফায়েত আলম নায়েমে যোগদান করেন। অত্যন্ত সুচতুর এই কর্মকর্তা তৎকালীন ডিজি ও পরিচালক, প্রশাসন ও অর্থ; এর দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অল্পদিনের মধ্যে নায়েমের সমস্ত কেনাকাটা তিনি নিজ হেফাজতে নেন। কৌশলে তিনি মহাপরিচালকের এবং বাজেট শাখার গোপন পাসওয়ার্ড নিজের কবজায় নেন। এর পর তিনি হয়ে ওঠেন বেপরোয়া । নিজের খেয়াল খুশি ও পছন্দ মতো সব কিছু করতে শুরু করেন। টেন্ডার এমনকি ডিজি যে সকল পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন তা তার হাতে সম্পন্ন করেন। তিনি নায়েমের বাজেটের বিভিন্ন খাত থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা দূর্নীতি করেছেন। 

ড. শাফায়াত আলমের দূর্নীতির কৌশল হলো তিনি অর্থ বছরের মে মাসের শেষের দিকে বা জুন মাসের মধ্যে কেনাকাটা শুরু করেন। প্রতি বছর বিভিন্ন অজুহাতে তিনি কেনাকাটা করেন না। অর্থ বছরের শেষে কেনাকাটা করলে তা যাচাই বাচাই করার সময় ও সুযোগ থাকে না। তাছাড়া উর্ধ্বতন কর্মকর্তা কর্তৃক বাজেট বাস্তবায়নের ফলে তার দূর্নীতির বিষয়ে কেউ মুখ খোলেন না। তার কাছে নায়েমের পুরো প্রশাসন জিম্মি। এক্ষেত্র নায়েমে দীর্ঘদিন থাকা সহকারী পরিচালক, কমন সার্ভিস; দূর্নীতির অংশীদার হয়ে তাকে সমর্থন দিয়ে গেছেন।

কেনাকাটা সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ শাফায়েত একাই করেন। অনুমোদনের জন্য ডিজি ও পরিচালকের প্রয়োজন হয় না। নিজেকে নিরাপদ রাখার জন্য তিনি ইজিপির মাধ্যমে কেনাকাটা করেন। তবে আইডি ও পাসওয়ার্ড তার কাছে থাকার কারনে, যার সাথে তার অবৈধ চুক্তি হয়, তাকে আগে থেকেই মালের রেট, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের শর্ত, টেন্ডারের পরিমান সবকিছুই বলে দেন। ফলে ইজিপিতে টেন্ডার ড্রপ করলে শুধু তার লোকই কাজ পেয়ে যায়।

ড. সাফায়েত আলমের এই ব্যাপক দূর্নীতির বিষয় নায়মের ছোট বড় সকল শ্রেনীর কর্মকর্তা জানেন।

নায়েমের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ ইইডি (শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর) করার কথা থাকলেও গত ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের নায়েমের রাজস্ব খাতের বাজেট কর্তন করে দুই কোটি টকায় দুটি ক্লাস রুমের অটোমেশনের কাজ করান। সে কাজ কৌশলে তার নিকট আত্মীয়কে দিয়ে করিয়েছিলেন। দূর্নীতির এই মহোৎসব কয়েকজন টের পেয়ে গেলে প্রথমে টেন্ডার বাতিল করে পুনরায় আবার টেন্ডার করে তার আত্মীয়কে দিয়ে কাজ করান। এতে কাজ করার পূর্বেই তার আত্মীয়কে ১,২৯, ২৩,৯৬৭/-(এক কোটি উনত্রিশ লাখ তেইশ হাজার নয়শত সাতষট্টি) টাকা অগ্রীম প্রদান করেন। উক্ত অটোমেশন বাবদ ২২,৭৪,৭৯১ /-(বাইশ লক্ষ চুয়াত্তর হাজার সাতশত একানব্বই) টাকার বৈদ্যুতিক সরাঞ্জামাদি ক্রয় করেন, যার মধ্য আড়াই লক্ষ টাকার সরঞ্জাম নায়েমে পৌছায়। এরপর ৮০,২২,১৯৭ /- (আশি লক্ষ বাইশ হাজার একশত সাতানব্বই) টাকার অফিস সরঞ্জাম ক্রয় করেন, এর মধ্য মাত্র ১০ লাখ টাকার মালামাল নায়েমে পৌছায়।

কথিত আছে ড. সাফায়েত আলম গত অর্থ বছরে নায়েম হতে প্রায় ২ কোটি টাকা দূর্নীতি করে উপার্জন করেছেন।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে একজন কর্মকর্তা বলেন, "ড. সাফায়াত আলম দূর্নীতির লালসায় লিপ্ত আছেন। এই বছরও তিনি প্রশিক্ষন ব্যাগ সরবরাহকারীর নিকট হতে ৯০০০০০/- (নয় লক্ষ) টাকা নিয়ে ৩০০০/- (তিন হাজার) ব্যাগ সরবরাহের কার্যাদেশ দিয়েছেন।

ড সাফায়াত নায়েমে অহরহ কম্পিউটার প্রিন্টারের টোনার ক্রয় করতেন। প্রতিটি টোনারের মূল্য দেখিয়েছেন ১৩০০০/১৪০০০ টাকা, যার প্রকৃত মূল্য ৫০০০ টাকার বেশি নয়।

করোনা আক্রান্ত হবার ভয়ে যখন কোন কর্মকর্তা অফিসমুখী হতেন না, সে সময়টাতে ড. শাফায়াত আলম অফিসে বসে কেনাকাটা করে দূর্নীতি করার ছক আকতেন, এটা অফিসের সকল কর্মকর্তা কর্মচারী জানেন।

ড. সাফায়েত আলমের মত উচ্চ শিক্ষিত সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী ও মেধাবী ব্যক্তির দ্বারা দেশের কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের কষ্টার্জিত ভ্যাট ট্যাক্সের টাকা আত্মসাৎ করা কোনভাবেই গ্রহনযোগ্য নয়। এই ধরনের অভিযোগের সুষ্টু তদন্ত প্রয়োজন।

Shamiur Rahman

Related