দুদকের চেয়ারম্যান হচ্ছেন সাবেক বিচারপতি মোতাহার হোসেন

Published: 09 March 2026 08:03

গতকাল (৮ই মার্চ) সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানতে পারলাম, দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে আলোচিত সেই বিচারক মোতাহার হোসেনকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে

২০১৩ সালের ১৫ নভেম্বরের একটি ঘটনা নিয়ে আজকের এই বিশেষ প্রতিবেদন। সেই সময়কার আদালতপাড়ার একজন সৎ, অভিজ্ঞ ও আলোচিত বিচারক মোতাহার হোসেন ব্যক্তিগত গাড়িতে চড়ে যাচ্ছিলেন ধানমণ্ডিতে এক সহকর্মীর বাসায়। এসময় তার গাড়িকে পিছন থেকে অনুসরণ করতে থাকে দুইটি মাইক্রোবাস। সহকর্মীর বাসার গেটে পৌঁছালে এই বিষয়টি তার নজড়ে আসে। কিন্তু ততক্ষণে তার গাড়ি চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে অস্ত্রধারী সাদা পোশাকের কয়েকজন। এদের মধ্যে একজন তৎকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আইন সচিব জহিরুল আলম দুলাল। সে ছাড়া অন্য সবাই ডিজিএফআইয়ের উচ্চপদস্থ কর্তা।

আইন সচিব দুলাল বিচারক মোতাহার হোসেনকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ঐ বাড়ির দোতলায় নিয়ে যেয়ে একটি মামলার সাজানো রায় তার হাতে ধরিয়ে দেন। পিস্তলে বুলেট লোড করতে করতে দুলাল বিচারক মোতাহার হোসেনের উদ্দ্যেশ্যে বলেন, এই রায় আগামী পরশু দিবেন। সরকার থেকে যে রায় লিখে দেওয়া হয়েছে, এর বাইরে রায় দিলে কিংবা কোনো টুঁ-শব্দও করা হলে বুক ঝাঁঝরা করে দেওয়া হবে। এসময় তাকে বলা হয়, এই রায় দিলে সরকার এক সপ্তাহের মধ্যে তাকে সুপ্রীম কোর্টের জাস্টিস বানিয়ে দিবে। সেদিন এই ঘটনার সময় একদম নির্লিপ্ত ছিলেন বিচারক মোতাহার হোসেন।

আলোচিত সেই মামলাটি ছিল বিএনপির তৎকালীন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুদকের দায়েরকৃত দুর্নীতির ভুয়া মামলা।

উক্ত ঘটনার একদিন পর ১৭ নভেম্বর ঐ মামলার রায় ঘোষণার দিন। সরকারের লিখে দেওয়া রায়ের কপি হাতে নিয়ে নির্ধারিত সময়ে  এজলাসে ঢুকেন মোতাহার হোসেন। কিন্তু কৌশলে তিনি আগের দিনই নিজের ভাগিনাকে দিয়ে রায়ের সঠিক কপি এজলাসের পাশে তার বাথরুমে লুকিয়ে রাখেন।

আদালতে রায় ঘোষণা শুরু হলো। সব তথ্য উপাত্ত বিচার-বিশ্লেষণ ও সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মোতাহার হোসেন রায় দিলেন। দুর্নীতির কোনো প্রমাণ না থাকায় তারেক রহমান এই মামলায় খালাস পেলেন।

ন্যায়বিচারের রায় দিয়ে সরকারের রোষানল থেকে বাঁচতে দ্রুত আত্মগোপনে চলে যেতে হয় মোতাহার হোসেনকে। পরে ভাগ্যক্রমে তিনি স্বল্প সময়েই পালিয়ে মালেশিয়ায় যেতে সক্ষম হন।

এদিকে, মোতাহার হোসেনকে না পেয়ে তার ছেলেকে কারাবন্দী করে হাসিনার প্রশাসন। অন্যদিকে, বিদেশে মোতাহার হোসেনের জীবন কাটে অনেক কষ্টে। অভাব-অনটনের কারণে স্ত্রীকে এক সময়ে দেশে পাঠাতে বাধ্য হন। আর্থিক সংকটে সঠিক চিকিৎসা না পেয়ে মারা যান তার সহধর্মিণী।

স্বাভাবিকভাবেই পাঠকমনে প্রশ্ন জাগতে পারে; এতদিন পর আজ কেন এই গল্প শেয়ার করছি?

গতকাল (৮ই মার্চ) সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানতে পারলাম, দুদক চেয়ারম্যান হিসেবে আলোচিত সেই বিচারক মোতাহার হোসেনকে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এই তথ্য ছড়িয়ে পড়তেই আদালতপাড়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে উচ্ছাস প্রকাশ করে বলছেন, মোতাহার হোসেন এমন একজন সৎ, সাহসী ও নির্ভীক বিচারক যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসিনার লিখে দেওয়া ফরমায়েশি রায়কে ছুড়ে ফেলে ন্যায়সঙ্গত রায় দেন। তিনিই হচ্ছেন ‘বিচারক’ শব্দের সঙ্গে সুবিচার করা শেখ হাসিনার দুঃশাসনের সময়ে সাহসী বীর।

দুদক হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এই জায়গাতে যদি সৎ, সাহসী ও নির্লোভ ব্যক্তিকে চেয়ারে বসানো না হয়, তাহলে দেশের জন্য ভালো কিছু আশা করা যায় না।

যে প্রতিষ্ঠান আমলাদের দুর্নীতির টুঁটি চেপে ধরবে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর ফাঁকি দেওয়া মালিকদের টুঁটি চেপে ধরবে, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবেদ বিচারের মুখোমুখি করাবে; সেই প্রতিষ্ঠানের প্রধানকে হতে হবে  দুর্দান্ত সাহসী, সৎ ও নির্লোভী ব্যক্তি।

তারেক রহমান এই পদে কোন দলীয় লোকদের না বসিয়ে সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেনকে দুদকের চেয়ারম্যান পদে দায়িত্বভার দিতে যাচ্ছেন। এটি শুনে আমরা সত্যিই আশাবাদী হচ্ছি। এখন বুঝতে পারছি, তিনি কেন সকালে নিজ অফিসে প্রবেশ করার আগেই অধীনস্ত কর্মকর্তাদেরকে বলছেন, ‘চলেন, যুদ্ধ করি!’

Shamiur Rahman

Related