প্রধানমন্ত্রীর "ফ্যামিলি কার্ড" হবে জনগনের আস্থার পরীক্ষা
আজ মঙ্গলবার (১০ই মার্চ) সকাল ১০টায় রাজধানীর বনানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে নারীদের হাতে কার্ড তুলে দিয়ে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
দীর্ঘ জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বহুল আলোচিত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের পরীক্ষামূলক (পাইলট) কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। প্রথমেই রাজধানীর কড়াইল এলাকায় এই কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
আজ মঙ্গলবার (১০ই মার্চ) সকাল ১০টায় রাজধানীর বনানীর টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে নারীদের হাতে কার্ড তুলে দিয়ে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এদিনই সুবিধাভোগীদের মোবাইল ফোনে পৌঁছে যাবে প্রথম মাসের নগদ সহায়তা।
পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রথম ধাপে দেশের ১৩ জেলার ১৩টি সিটি করপোরেশন ও ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডের মোট ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবার এই কার্ডের আওতায় আসবেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে এই প্রথম ফ্যামিলি কার্ড দিচ্ছে সরকার। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন ও স্বচ্ছতাই হবে জনগণের আস্থার পরীক্ষা।
সদ্যসমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ঘোষিত ইশতেহারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি ছিলো অন্যতম এক প্রতিশ্রুতি। এটি দরিদ্র, নিম্নবিত্ত ও প্রান্তিক পরিবারের অর্থনৈতিক সুরক্ষা এবং নারীর ক্ষমতায়নের একটি সাহসী উদ্যোগ ছিলো।
নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভের পর সরকার গঠনের তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করছে। সূত্র মতে, রাজধানীর কড়াইল বস্তি থেকে এই কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। এটিকে ইতিবাচক সূচনা হিসেবেই দেখছেন সর্বস্তরের জনগণ।
‘ফ্যামিলি কার্ড’ কি?
‘ফ্যামিলি কার্ড’ মূলত একটি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি, যার মূল লক্ষ্য দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেয়া। প্রতি মাসে ২,৫০০ টাকা অথবা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য (চাল, ডাল, তেল, লবণ ইত্যাদি) এই কার্ডধারীদের দেওয়া হবে। এই কার্ড পরিবারের নারী প্রধানের (গৃহিণী) নামে ইস্যু করা হবে, যাতে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ে।
উল্লেখ্য, ফ্যামিলি কার্ড শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নয়, বরং পুষ্টি উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনের একটি সমন্বিত পদক্ষেপ হিসেবে পরিকল্পিত।
প্রাথমিকভাবে কয়েকটি উপজেলা ও এলাকায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে সারাদেশে বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে দেশব্যাপী ফ্যামেলি কার্ড বিতরণ করা হবে।
এই দ্রুত বাস্তবায়ন সরকারের প্রতিশ্রুতিবদ্ধতার প্রমাণ। ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম বড় উদ্যোগ হিসেবে এই কর্মসূচি জনগণের মধ্যে ব্যাপক আশা জাগিয়েছে। বিশেষ করে যারা নির্বাচনে এই প্রতিশ্রুতির ওপর ভর করে ভোট দিয়েছিলেন; তাদের কাছে এই কর্মসূচি দ্বারা সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপের কষ্ট থেকে সরাসরি স্বস্তি।
কড়াইলের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও দরিদ্র এলাকা থেকে উদ্বোধনের সিদ্ধান্ত জনমনে সরকারের আন্তরিকতা ও এই কর্মসূচির প্রতীকী তাৎপর্য তুলে ধরেছে। এর মধ্য দিয়ে সরকার প্রকৃত প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাতে চায়। তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার ওপর।
অতীতে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে (ভিজিডি, ভিজিএফ, ওএমএস ইত্যাদি) সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে। এবার ফ্যামিলি কার্ডের ক্ষেত্রেও সেই ঝুঁকি রয়েছে। কার্ড বিতরণের নামে মধ্যস্বত্বভোগীদের টাকা আত্মসাৎ, অযোগ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তি বা যোগ্যদের বাদ পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সরকার ইতোমধ্যে এই বিষয়ে সতর্কতামূলক বার্তা দিয়েছে। কিন্তু কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করতে হবে। নইলে ভালো কাজের বিপরীতে সমালোচনার মুখে পড়বে সরকার।
বিশ্লেষকদের মতে, এই কর্মসূচি ঘিরে বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ অপরিহার্য। প্রথমত, সুবিধাভোগী নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ডাটা-ভিত্তিক হতে হবে। কার্ড পাওয়ার জন্য দারিদ্র্যের মানদণ্ড (যেমন: আয়ের সীমা, পরিবারের আকার, নারী-প্রধান পরিবার, প্রতিবন্ধী সদস্য ইত্যাদি) স্পষ্ট করে জাতীয় পরিচয়পত্র বা অন্যান্য ডাটাবেসের সঙ্গে যুক্ত করে তালিকা প্রণয়ন করা উচিৎ। দ্বিতীয়ত, বিতরণ প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল পদ্ধতি (মোবাইল ব্যাংকিং বা ডাইরেক্ট ক্যাশ ট্রান্সফার) ব্যবহার করে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমানো যেতে পারে। তৃতীয়ত, স্থানীয় প্রশাসন, এনজিও ও সুশীল সমাজের সমন্বয়ে মনিটরিং সেল গঠন করে নিয়মিত অডিট ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে। চতুর্থত, রাজনৈতিক পক্ষপাত এড়াতে তৃনমূলে দলীয় নেতাকর্মীদের প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি। এটি যেন কোন দলের ‘ভোট ব্যাংক’ না হয়ে সত্যিকার অর্থে প্রাপ্যদের হাতে পৌঁছায়।
সরকারের উচিত এই কর্মসূচি টার্গেট করে এগোনো। অর্থাৎ প্রথম পর্যায়ে অত্যন্ত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া, তারপর ধাপে ধাপে বিস্তার। একই সাথে এর সঙ্গে অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির (যেমন: বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা) সমন্বয় করে দ্বৈততা এড়ানো দরকার। দীর্ঘমেয়াদে এটি শুধু সহায়তা নয়, বরং দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বীতার সঙ্গে যুক্ত করলে স্থায়ী ফল পাওয়া যাবে।
সব মিলিয়ে, ফ্যামিলি কার্ড একটি অপার সম্ভাবনাময় উদ্যোগ। এটি সফল হলে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ হবে। সরকারের জনমুখী ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হবে। কিন্তু সাফল্য নির্ভর করবে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর। জনগণের আস্থা ধরে রাখতে হলে সরকারকে এই কর্মসূচিকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে পরিচালনা করতে হবে। প্রতিশ্রুতি রক্ষার এই প্রথম ধাপ সফল হলে ভবিষ্যতের অন্যান্য প্রতিশ্রুতিগুলোও আস্থার সঙ্গে গ্রহণযোগ্য হবে।
দেশবাসী প্রত্যাশা করছে, এই কার্ড যেন সত্যিকার অর্থে প্রাপ্য মানুষের হাতে পৌঁছায় এবং তাদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কড়াইল বস্তি থেকে ফ্যামিলি কার্ড উদ্বোধন করবেন। ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে কাউকেই সমালোচনার সুযোগ দেয়া হবে না। আগামী ৬ মাসের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম ও ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ সম্পন্ন হবে ইনশাআল্লাহ।
উল্লেখ্য, আজ (মঙ্গলবার) থেকে পরীক্ষামূলক ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে রাজধানীর কড়াইল বস্তি, সাততলা বস্তি, ভাসানটেক বস্তি, মিরপুর সার্কেল বা শাহ আলীর ওয়ার্ড-৮, আলিমিয়ার টেক বস্তি ওয়ার্ড-১৪ ও বাগানবাড়ি বস্তি এলাকা।
এছাড়া, ঢাকার বাইরে রাজবাড়ীর পাংশা, চট্টগ্রামের পটিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর, বান্দরবানের লামা, খুলনার খালিশপুর, ভোলার চরফ্যাশন, বগুড়া সদর, সুনামগঞ্জের দিরাই, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, নাটোরের লালপুর, ঠাকুরগাঁও সদর এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ এলাকায় এই কার্ড বিতরণ করা হবে।
Shamiur Rahman
