বিপুল চাহিদায় নকল ওষুধ তৈরি

Published: 28 September 2021 00:09

বিপুল চাহিদায় নকল ওষুধ তৈরি

ওষুধ রোগাক্রান্ত মানুষের জীবন রক্ষা করে। আবার ওষুধই মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে নকল বা ভেজাল ওষুধের কারণে। এখন জীবন-মৃত্যুর যেন রশি টানাটানি শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষের সুস্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষা নিয়ে দেখা দিয়েছে মহা শঙ্কা।

ওষুধ রোগাক্রান্ত মানুষের জীবন রক্ষা করে। আবার ওষুধই মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে নকল বা ভেজাল ওষুধের কারণে। এখন জীবন-মৃত্যুর যেন রশি টানাটানি শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষের সুস্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষা নিয়ে দেখা দিয়েছে মহা শঙ্কা। নকল বা ভেজাল ওষুধ সেবনের ফলে রোগ ভালো হওয়ার পরিবর্তে আরও অসুস্থতা বাড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ঔষধ প্রশাসন অধিদফতর মাঝেমধ্যে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করলেও বন্ধ হচ্ছে না নকল-ভেজাল ওষুধের কারবার। 
 
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেকটা বৈধ কোম্পানির মতো ‘চাহিদাপত্র’ দিয়ে উৎপাদন করানো হচ্ছে এসব নকল-ভেজাল ওষুধ। বিশেষ করে যখন কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ে বা যে ওষুধের চাহিদা বাড়ে তখনই বেশি সোচ্চার হয়ে উঠছে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা ভয়ঙ্কর এই নকল ওষুধ চক্র। ব্যাপক মুনাফার লোভে এক শ্রেণির ফার্মেসি এসব নকল ওষুধ বিক্রিতে সহায়তা করছে, যার সিংহভাগই ঘটছে মফস্বল শহর বা গ্রামাঞ্চলে। সম্প্রতি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ, এলিট ফোর্স র‌্যাব এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদফতরের নকল-ভেজাল ওষুধবিরোধী বেশ কয়েকটি অভিযানের পর জানা গেছে আরও নানা তথ্য। 
 
পুলিশ ও র‌্যাবের একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা থেকে জানা যায়, পুরান ঢাকার টিপু সুলতান রোডে বেশ কিছু কারখানার সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব কারখানায় যে-কেউ গেলেই তাকে ওষুধের ডাইস বানিয়ে দেওয়া হয়। তবে সাম্প্রতিক অভিযানের পর তারা খুব কৌশলী হয়েছে। অন্যদিকে গোয়েন্দারাও ভালোমতো নজর রেখেছেন। একইভাবে রাজধানীর ফকিরাপুল-মতিঝিল এলাকায় তৈরি হয় নকল-ভেজাল ওষুধের প্যাকেট ও ফয়েল পেপার। এ রকম কিছু প্রিন্টিং প্রেসের দিকেও নজরদারি করা হচ্ছে। 
 
কর্মকর্তারা জানান, চাহিদাপত্র অনুসারে নকল বা ভেজাল ওষুধ উৎপাদনের জন্য কয়েকটি গ্রুপে কাজ সম্পন্ন হয়ে থাকে। এর মধ্যে একটি গ্রুপ কাঁচামাল সংগ্রহ করে থাকে। আরেকটি গ্রুপ ডাইস তৈরি করে, আরেক গ্রুপ বানায় প্যাকেট এবং অন্য একটি গ্রুপের কাজ ফয়েল পেপার তৈরি করা। এভাবে হুবহু নকল ওষুধ তৈরি সম্পন্ন হলে চাহিদাপত্র অনুযায়ী সেগুলো গ্রহণ করে মূল হোতা। এরপর সেগুলো নিজস্ব বা বিভিন্ন কোম্পানি একশ্রেণির প্রতিনিধির (রিপ্রেজেন্টেটিভ) মাধ্যমে আসল ওষুধের আড়ালে ছড়িয়ে দেয় গ্রামাঞ্চলের ফার্মেসিগুলোতে।
 
 
সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, নামসর্বস্ব কোম্পানি বা লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানে নকল বা ভেজাল ওষুধ বেশি উৎপাদন হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটিও সহজ ও সাধারণ মানুষের সন্দেহের বাইরে থাকে। কেননা ওষুধ উৎপাদনের জন্য যেসব উপাদান বা সরঞ্জাম লাগে তার প্রায় পুরো ‘সেটআপ’ থাকে ওইসব প্রতিষ্ঠানে। ফলে সহজেই তারা নকল বা ভেজাল ওষুধ উৎপাদন করতে পারে। এসব কারখানায় নামিদামি কোম্পানির ব্র্যান্ড বা মোড়ক নকল করে বাজারজাত করা হয়ে থাকে নকল বা ভেজাল ওষুধ। বিশেষ করে যে ওষুধগুলোর বাজারমূল্য কিছুটা বেশি, সেগুলোকেই বেশি টার্গেট করা হয়। বাজারজাতের জন্য টার্গেট করা হয় গ্রামাঞ্চলের বাজার এবং সহজ-সরল মানুষকে। কেননা, এসব নকল ওষুধ আসল ব্র্যান্ডের ওষুধের চেয়ে অনেক কমদামে অসাধু ফার্মেসি মালিকরা বিক্রি করে থাকে। দাম কম হওয়ায় সাধারণ মানুষও কিনছে হরহামেশাই। 
 
গত ৪ সেপ্টেম্বর ওষুধ নকলকারী চক্রের সাতজনকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) লালবাগ বিভাগ। রাজধানীর কাজলা, আরামবাগ ও মিটফোর্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতারের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ নকল ওষুধ, ওষুধ তৈরির সরঞ্জাম ও ওষুধের খালি বাক্স উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে ক্যানসার ও করোনাসহ গুরুতর অনেক রোগেরই ওষুধ রয়েছে। পুলিশের ধারণা, জড়িতরা ধরা না পড়লে এ ওষুধগুলোও রোগীর উদ্বিগ্ন স্বজনরা কিনে নিত এবং তাতে বহু রোগীর মৃত্যু হতে পারত। 
 
নকল ও ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে গত দুই সপ্তাহেই ডিবি পুলিশের লালবাগ বিভাগের অন্তত তিনটি অভিযান পরিচালিত হয়েছে রাজধানীর মিটফোর্ডসহ বিভিন্ন এলাকায়। এ সময় বিপুল নকল ওষুধসহ জড়িত চক্রের বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই চক্রটি করোনাকালে চাহিদা অনুযায়ী নকল ওষুধ তৈরি করে সরবরাহ করে যাচ্ছিল। 

Related