হরমুজে উত্তেজনা, বাজারে মূল্যস্ফীতি—সংকটের অর্থনীতি ও আমাদের বাস্তবতা
এই প্রভাব ধাপে ধাপে ছড়িয়ে পড়ে— জ্বালানি → পরিবহন → পাইকারি → খুচরা → ভোক্তাপর্যায়ে!একটি প্রণালীর ঢেউ এভাবেই আমাদের জীবনে বহুস্তর অর্থনৈতিক তরঙ্গ সৃষ্টি করে
মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে সরু এক জলরেখা—হরমুজ প্রনালী। কিন্তু অর্থনীতির ভাষায় এটি কেবল জলপথ নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের একটি কৌশলগত চোকপয়েন্ট।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৭০–২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়—যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। এছাড়া বৈশ্বিক এলএনজি (তরলীকৃত গ্যাস) বাণিজ্যেরও প্রায় ২৫–৩০ শতাংশ এই পথনির্ভর। অর্থাৎ এখানে উত্তেজনা মানেই বিশ্ববাজারে সরবরাহ-ঝুঁকি; আর সরবরাহ-ঝুঁকি মানেই মূল্য-অস্থিরতা।
বৈশ্বিক দাম বাড়লে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব কতটা? বাংলাদেশ তার জ্বালানির বড় অংশ আমদানি করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে আনুমানিক ৭–৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যদি প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়ে, তাহলে বছরে অতিরিক্ত কয়েকশ’ মিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।
এতে তিনটি তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে—
১. আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি → বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ
২. পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি → পাইকারি ও খুচরা বাজারে মূল্যবৃদ্ধি
৩. উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি → শিল্পখাতে মুনাফা সংকোচন।
বাংলাদেশে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি সাম্প্রতিক সময়ে ৯–১০ শতাংশের ঘরে ঘোরাফেরা করছে। জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এ হারকে আরও উঁচুতে ঠেলে দিতে পারে। অর্থনীতিতে একে বলা হয় কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন—খরচ বাড়ার চাপে মূল্যস্ফীতি।
রেমিটেন্স ও মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা
মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীর সংখ্যা প্রায় ৭০–৮০ লাখ। দেশের মোট রেমিটেন্সের প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি আসে এই অঞ্চল থেকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রেমিটেন্স প্রবাহ ছিল প্রায় ২৪–২৬ বিলিয়ন ডলার।
মধ্যপ্রাচ্যে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়লে—নির্মাণ ও অবকাঠামো প্রকল্পে ধীরগতি আসে, শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, প্রবাসী আয়ের প্রবাহে সাময়িক শ্লথতা দেখা দিতে পারে । রেমিটেন্স কমে গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভোগব্যয় কমে। ক্ষুদ্র ব্যবসা, এনজিও ঋণপরিশোধ, এমনকি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয়ও প্রভাবিত হয়।
পরিবহন ব্যয়
অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী চালক -বাংলাদেশের পণ্য পরিবহনের বড় অংশ সড়ক নির্ভর। ডিজেল মূল্য বাড়লে ট্রাকভাড়া বাড়ে, যা সরাসরি কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামে প্রতিফলিত হয়। গবেষণা বলছে, ডিজেলের দাম ১০% বাড়লে খুচরা খাদ্যদামে ১.৫–২% পর্যন্ত বৃদ্ধি ঘটতে পারে।
এই প্রভাব ধাপে ধাপে ছড়িয়ে পড়ে— জ্বালানি → পরিবহন → পাইকারি → খুচরা → ভোক্তাপর্যায়ে!একটি প্রণালীর ঢেউ এভাবেই আমাদের জীবনে বহুস্তর অর্থনৈতিক তরঙ্গ সৃষ্টি করে।
প্রত্যাশা-মনস্তত্ত্ব ও বাজার -অর্থনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো Expectations Effect। যদি বাজারে ধারণা তৈরি হয় যে তেলের দাম বাড়বে, ব্যবসায়ীরা আগাম দাম বাড়াতে পারেন। ভোক্তারা মজুত করতে শুরু করেন। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। পেট্রোল পাম্পে লম্বা লাইন কেবল সরবরাহের কারণে নয়; ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মানসিক প্রতিক্রিয়াও এর বড় কারণ।
বৈদেশিক মুদ্রা ও মুদ্রাস্ফীতি-
তেলের দাম বাড়লে আমদানি বিল বাড়ে। ডলারের চাহিদা বাড়ে। ফলে টাকার ওপর চাপ তৈরি হয়। মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলে আমদানিকৃত সব পণ্যের দাম বাড়ে—জ্বালানি ছাড়াও ভোজ্যতেল, গম, ডাল, শিল্প কাঁচামাল। এভাবে একটি ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি ম্যাক্রোইকোনমিক চেইনে পরিণত হয়।
করণীয় বা কৌশলগত প্রস্তুতি নেওয়া যেতে পারে (প্রস্তাবিত) যদিও এটা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর
১. জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্য—মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা কমানো ,
২. কৌশলগত রিজার্ভ গঠন—স্বল্পমেয়াদি ঝাঁকুনি সামলাতে
৩. দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি ও তেল চুক্তি—মূল্য স্থিতিশীলতায়
৪. বায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ—সৌর ও বায়ু শক্তিতে গতি
৫. স্বচ্ছ বাজার তদারকি—অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি রোধের মাধ্যমে । অর্থনৈতিক অভিঘাত কখনো ঠেকানো যায় না, কিন্তু প্রস্তুতি থাকলে ক্ষতি কমানো যায়।
সবশেষে, হরমুজ প্রণালীর ঢেউ কেবল আন্তর্জাতিক শিরোনাম নয়; এটি আমাদের বাজার, রেমিটেন্স, কিস্তি, বিয়ে ও ঈদের অঙ্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিশ্ব রাজনীতির দাবা বোর্ডে আমরা গুটি না হলেও, বিশ্বায়নের অভিঘাত আমাদের ঘরেও আঘাত করে । তাই প্রয়োজন, আতঙ্কের পরিবর্তে প্রস্তুতি, গুজবের পরিবর্তে সঠিক তথ্য, নির্ভরতার পরিবর্তে –বৈচিত্র্যকেই আমাদের ধারণ করতে হবে। সমুদ্রের ঢেউ থামানো যায় না, কিন্তু অর্থনীতির নৌকাকে শক্ত করে বাঁধা যায়—যাতে হরমুজে ঝড় উঠলেও আমাদের হাঁড়ির টুংটাং শব্দ অসহনীয় না হয়ে ওঠে।
লেখক একজন উন্নয়ন কর্মী ও নীতি বিশ্লেষক
Shamiur Rahman
