৫৫ বছর পর টাঙ্গাইলের মধুপুর বনে লেক সংস্কার চলছে
গত ৭ ফেব্রুয়ারী গড়গড়িয়া লেক সংস্কার কাজের উদ্বোধন করেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন
টাঙ্গাইল জেলার "মধুপুর গড়" সকলের পরিচিত। প্রতিদিন এই বনে দেশ-বিদেশের পর্যটকরা আনন্দ ও বিনোদন করতে আসেন। আরও সৌন্দর্যবর্ধনে বন বিভাগের উদ্যোগে মধুপুরের জীব বৈচিত্র রক্ষা এবং বন্য প্রাণীর পানির সংকট নিরসনে গড়গড়িয়া লেক সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে। লেক পুনঃখনন ও সংস্কার কাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। খননকাজ ও সংস্কার শেষ হলে বনের সৌন্দর্য ও আকর্ষণ বাড়বে। সরকারের রাজস্বও বাড়বে।
এদিকে লেক পুনঃখননের কারনে উজানের আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে বলে আশংকা করছে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্টির একটি অংশ। কিন্তু লেকটি সংস্কারের ফলে মধুপুর বনের জীববৈচিত্রে প্রান ফিরে আসবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শালবন পুনঃপ্রতিষ্ঠা প্রকল্পের অধীনে গত ৭ই ফেব্রুয়ারী মধুপুর জাতীয় উদ্যান রেঞ্জে আনুষ্ঠানিকভাবে গড়গড়িয়া লেকের পুনঃখনন কাজ শুরু করে বন বিভাগ। এরপর থেকেই স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর একটি অংশ নানা বিভ্রান্তি ছড়াতে শুরু করে। ফলে লেক সংস্কারের কাজে কিছুটা বিঘ্ন ঘটে। বন বিভাগ প্রথম থেকেই এই বিরোধিতাকে উদ্দেশ্যপ্রণেদিত ও বিভ্রান্তিমুলক বলে মনে করছে। সরকারি কাজে বাধাদানকারীরা একটি গোষ্ঠীর পক্ষে কাজ করছে।
ঐতিহ্যবাহী মধুপুর গড়ের ৪৫ হাজার ৫৬৫ দশমিক ১৮ একর বনভুমিতে চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, মুখপোড়া হুনুমান এবং অনেক প্রজাতির পশুপাখির আবাসস্থল। এসব বন্য পশুপাখির পানির প্রয়োজনীয়রা নিশ্চিত করতে ১৯৭০ সালের দিকে গড়গড়িয়া লেক খনন করা হয়। এরপর গত প্রায় ৫৫ বছরে লেকটি পুনঃখনন বা সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে লেকের অধিকাংশ জায়গা ভরাট হয়ে যায়। শুস্ক মৌসুমে পানি শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। ফলে বন্যপ্রানী ও পশু পাখি পানির অভাবে বিপদে পড়ে।
সার্বিক বিবেচনায় বন্যপ্রানী ও পাখির জন্য বছরজুড়ে পানির নিশ্চয়তা, জলাভুমির ইকোসিস্টেম ও জলজ প্রান সংরক্ষন, শুষ্ক মৌসুমে বনের ভেতরে আগুন লাগলে তা নেভানোর কাজে পানির উৎস তৈরিকরণ ও গায়রা গ্রামের ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর কৃষিকাজের সেচ সুবিধা সহ নানা লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য নিয়ে লেকটি পুনঃখননের উদ্যোগ নেয় বন বিভাগ।
টাঙ্গাইল বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলমান প্রকল্পের মাধ্যমে লেকটির গভীরতা বাড়ানো হচ্ছে। এতে সারা বছর বন্যপ্রানী ও পাখির জন্য পানির নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে। এছাড়া ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী ও স্থানীয়দের আবাদি জমি যাতে ক্ষতিগ্রস্থ না হয় সেজন্য লেক থেকে উত্তোলনকৃত মাটি বনের কাছে পরিত্যক্ত জমিতে রাখা হচ্ছে। যা স্থানীয়দের আবাদি জমির থেকে অন্তত আধা কিলোমিটার দুরে।
গত ৭ ফেব্রুয়ারী গড়গড়িয়া লেক সংস্কার কাজের উদ্বোধন করেন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন, জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক, মধুপুর জাতীয় উদ্যান সহব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি লাল মিয়া ও স্থানীয় গন্যমান্য ব্যাক্তি।
জানতে চাওয়া হলে জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জ কর্মকর্তা মোশারফ হোসেন জানান, লেক থেকে উত্তোলন করা মাটি খুবই সর্তকতার সাথে সরানো হচ্ছে। যাতে স্থানীয়দের আবাদী জমি ক্ষতিগ্রস্থ না হয়।
লেক পুনঃখননের বিষয়ে জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক বলেন, গড়গড়িয়া লেকের উজানে আদিবাসীদের প্রচুর ধানী জমি রয়েছে। লেকের কাছে পানি নিষ্কাশনের জন্য ১৯৭৭ সালে একটি দীর্ঘ একটি নালা খনন করা হয়। নালাটি বর্তমানে অচল অবস্থায় রয়েছে। উক্ত নালাটি পরিস্কার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। পরিস্কার করা না হলে অনেক আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। এই লেকটির সংস্কার হলে বনের পশু-পাখিদের জন্য সুপেয় নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা হবে বলে মনে করেন ইউজিন নকরেক।
এই ব্যপারে টাঙ্গাইল বিভাগীর বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন এই প্রতিবেদককে জানান, সংস্কার কাজ শেষ হলে গড়গড়িয়া লেক মধুপুর গড়ের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও বন্যপ্রানী টিকে থাকার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে উঠবে। বাড়বে সৌন্দর্য ও আকর্ষণ। এতে সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।
Shamiur Rahman
