মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক: উন্নয়নের নামে বিপজ্জনক পরীক্ষা
নতুন ব্যাংক সৃষ্টি সমাধান নয়; বরং বিদ্যমান ব্যাংক ব্যবস্থার সংস্কার এবং ক্ষুদ্রঋণ খাতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তাই যুক্তিসংগত পথ
বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ খাত কোনো সাধারণ আর্থিক খাত নয়। এটি দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা এবং গ্রামীণ অর্থনীতির এক অনন্য উন্নয়ন মডেল। ঋণের পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা ও জীবিকায়ন—এই সমন্বিত দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষুদ্রঋণ বাংলাদেশের নাগরিক সমাজকে শক্ত ভিত দিয়েছে। অথচ প্রস্তাবিত মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক অধ্যাদেশ সেই ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিচ্ছে।
মাত্র এক মাসের কম সময়ে জনমত নেওয়ার সুযোগ রেখে প্রায় ৭০০ লাইসেন্সপ্রাপ্ত এমএফআই, চার কোটি ঋণগ্রহীতা পরিবার এবং পাঁচ লক্ষাধিক কর্মীর ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে যখন দেশের দুর্গম ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় উন্নয়নের মূল ভার বহন করছে ছোট ও মাঝারি এনজিও এমএফআইগুলো।
ক্ষুদ্রঋণ কোনো ব্যাংকিং পণ্য নয়—এটি একটি সামাজিক হস্তক্ষেপ। ব্যাংকিং কাঠামো চাপিয়ে দিলে স্বাভাবিকভাবেই মুনাফা, মূলধন পর্যাপ্ততা ও কর্পোরেট শাসনই প্রধান হয়ে উঠবে। ফলে ‘মাইক্রোফাইন্যান্স-প্লাস’ কার্যক্রম সংকুচিত হবে এবং দারিদ্র্যের বহুমাত্রিক বাস্তবতা আড়ালে পড়ে যাবে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রস্তাবিত মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক খাতের প্রকৃত সমস্যাগুলোর কোনো সমাধান দেয় না। একাধিক ঋণ গ্রহণ, কর্মী আত্মসাত, খেলাপি ঋণ, স্বল্পসুদে পাইকারি তহবিলের অভাব কিংবা জটিল নিবন্ধন প্রক্রিয়া—এসব প্রশ্ন প্রস্তাবনায় অনুপস্থিত। বরং নতুন ব্যাংক কাঠামো এনজিও এমএফআইগুলোর সঙ্গে অসম ও অন্যায্য প্রতিযোগিতা তৈরি করবে।
দেশে ইতোমধ্যে ব্যাংকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। দুর্বল ব্যাংক টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রকে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। এই বাস্তবতায় নতুন ব্যাংক সৃষ্টি সমাধান নয়; বরং বিদ্যমান ব্যাংক ব্যবস্থার সংস্কার এবং ক্ষুদ্রঋণ খাতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তাই যুক্তিসংগত পথ।
ক্ষুদ্রঋণ খাত নিয়ে তাড়াহুড়ো করে ব্যাংকিং পরীক্ষা চালানো মানে একটি সফল সামাজিক উন্নয়ন মডেলকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। এই খাতের প্রয়োজন ধ্বংসাত্মক রূপান্তর নয়—প্রয়োজন সংলাপ, সংস্কার ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা। মোস্তফা কামাল আকন্দ ,
লেখক: পরিচালক, প্রশাসন; কোস্ট ফাউন্ডেশন
Shamiur Rahman
