চাঁদাবাজি ও হামলার ঘটনায় বিভিন্ন সংগঠনের তীব্র প্রতিবাদ
নরসিংদীতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা; ১৩ জনের নামে মামলা, গ্রেপ্তার ৩
এজাহারভুক্ত আসামিরা সবাই এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তারা সড়ক দখল করে চাঁদাবাজির পাশাপাশি এলাকায় মাদক কারবার ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত। এরা এলাকায় ‘মব সন্ত্রাসী' হিসেব পরিচিত।
নরসিংদীতে পিকনিক করে ফেরার পথে সাংবাদিকদের উপর হামলায় ঘটনায় জড়িত আরও একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই নিয়ে এই হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজন গ্রেপ্তার করা হলো। তবে এই হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া সন্ত্রাসী হারুন এখনও গ্রেপ্তার হয়নি।
এই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আটজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরো ৫ জনের নামে একটি মামলা দায়ের করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার আহত সাংবাদিক ফয়েজ আহমেদ নরসিংদীর মাধবদী থানায় এই মামলা করেন। এই ঘটনায় গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও বেশিরভাগ আসামি এখনও গ্রেপ্তার হয়নি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এজাহারভুক্ত আসামিরা সবাই এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী। তারা সড়ক দখল করে চাঁদাবাজির পাশাপাশি এলাকায় মাদক কারবার ও বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত। এরা এলাকায় ‘মব সন্ত্রাসী' হিসেব পরিচিত।
বিভিন্ন সংগঠনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ
এই ঘৃন্য হামলায় অন্তত ১২ জন সাংবাদিক আহত হয়। তাদের মধ্যে ছয় জনের অবস্থা গুরুতর। জড়িতদের অতিসত্বর গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবিতে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশনের ( ক্র্যাব) কার্যনির্বাহী কমিটি।
এছাড়া ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)সহ ল রিপোর্টার্স ফোরাম, র্যাক, পলিটিক্যাল রিপোর্টর্স ফোরাম, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক ফোরামসহ অন্যান্য আরও অনেক সংগঠন এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার দাবি জানিয়েছে।
জানতে চাইলে নরসিংদীর পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, ‘সাংবাদিকদের উপর হামলায় জড়িত দুজনকে এরই মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান চলছে।’
এই বিষয়ে ক্র্যাব সভাপতি মির্জা মেহেদী তমাল বলেন, ‘এই ঘটনায় মামলা হয়েছে। আশা করছি পুলিশ আসামিদের করে আইনের আওতায় আনবে।’
এক যৌথ বিবৃতিতে কার্যনির্বাহী কমিটির পক্ষ থেকে ডিআরইউ’র সভাপতি আবু সালেহ আকন ও সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল সাংবাদিকদের উপর এই ন্যাক্কারজনক হামলার তীব্র নিন্দা জানান।
বিবৃতিতে তারা বলেন, সাংবাদিকদের ওপর এই ধরনের হামলা পরিকল্পিত এবং চাঁদা আদায়ের প্রতিবাদ করায় এই হামলার ঘটনা প্রমাণ করে সন্ত্রাসীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে ডিআরইউ সারাদেশের সাংবাদিক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবে।
কেন ও কিভাবে হামলা
গত সোমবার ক্র্যাবের ‘ফ্যামিলি ডে’ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকরা বাসযোগে ঢাকায় ফেরার প্রস্তুতি নেয়। ড্রিম হলিডে পার্কের সামনে রাস্তার পাশে বাসটি সাময়িকভাবে দাড় করানো হলে স্থানীয় একদল সন্ত্রাসী চাঁদা দাবি করে। এতে সাংবাদিকরা প্রতিবাদ জানালে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে সন্ত্রাসীরা দেশীয় অস্ত্র দিয়ে সাংবাদিকদের উপর হামলা চালায়। হামলায় আহত অন্তত ১২ জন সাংবাদিকের মধ্যে ছয় জনের অবস্থা গুরুতর।
মামলায় যারা আসামি
মামলার আসামীরা হলেন, মো. আলাল সরকার (২৬), মো. বনি মিয়া (২৫), মো. হারুন মিয়া (৫২) মোহাম্মদ আলী (২৪), রিয়াসাদ আলী (২০), শাকিব (২২), মো. রোমান মিয়া (২৮), মো. মামুন (৩০) সহ অজ্ঞাতানামা ৪/৫ জন। এ ঘটনার পরপরই ১ ও ২ নং আসামীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
আহত সাংবাদিক এস এম ফয়েজ (৩৫) মামলার এজাহারে বলেন, অনুষ্ঠান সমাপ্ত হলে পর্যায়ক্রমে ক্র্যাবের সদস্য ও তাদের পরিবার পরিজন নিদিষ্ট বাসে উঠার জন্য পার্কিং প্লেসে আসে। তখন আমাদের ১২টি বাসের ৮টি বাস ২০০ টাকা করে পার্কিং ফি দিয়ে চলে গেলেও ৪টি বাস অপেক্ষমান ছিল। সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে নয়া দিগন্ত পত্রিকার সাংবাদিক মনির হোসেন তাকে বহনকারী বাসের ড্রাইভার ও হেলপারের সাথে আলী গাড়ী পার্কিং' এর মালিক বিবাদী মোঃ হারুন মিয়া (৫২) ও তার ছেলে ৪ ও ৫নং বিবাদীর সাথে ৬০০/- টাকা পার্কিং চার্জের দাবিতে বাক-বিতন্ডায় লিপ্ত হয়।
এসময় সাংবাদিক মনির হোসেন তাদের কাছে পার্কিং চার্জ আদায়ের রশিদ চাইলে উভয়পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতি শুরু হয়। এক পর্যায়ে বাদী সহ অন্যান্য সাংবাদিকরা এগিয়ে আসলে তাদেরকেও উপরোক্ত ৩নং বিবাদী মোঃ হারুন মিয়া (৫২) ও তার ছেলে ৪, ৫, ৬, ৭ ও ৮ নং বিবাদী এবং অন্যান্য এজাহারনামীয় আসামী ও অজ্ঞাতনামা আসামীরা একই উদ্দেশ্যে ধারালো দেশীয় অস্ত্র, দা, লাঠি-সোঠা নিয়ে অর্তকিতভাবে আমাদেরকে এলোপাথারীভাবে মারধর করিয়া নিলাফুলা জখম করে।
এজাহারে আরো বলা হয়, মারধরের একপর্যায়ে আসামী মোঃ আলাল সরকার তার হাতে থাকা ধারালো দা দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে আমার কপালের উপরিভাগে মাথায় আঘাত করিয়া গুরুত্বর কাঁটা রক্তাক্ত জখম করে। একই আসামী তার হাতে থাকা ধারালো দাঁ দিয়ে খবর সংযোগের সিনিয়র রিপোর্টার শহিদুল ইসলাম শাহেদকে হত্যার উদ্দেশ্যে আমার কপালের উপরিভাগে আঘাত করিয়া গুরুত্বর কাঁটা রক্তাক্ত জখম করে। আসামী মোঃ আলাল সরকার তার হাতে থাকা ধারালো দাঁ দিয়ে জিটিভির সিনিয়র রিপোর্টারমহসিন কবিরের ডান কানে কোপ মেরে কাঁটা জখম করে। ২নং আসামী মোঃ রনি মিয়া ওরফে রুবেল (২৫) তার হাতে থাকা লাঠি দিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সিনিয়র রিপোর্টার সাখাওয়াত কাউছারকে এলোপাতাড়ি বাড়ি মেরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে নিলাফুলা জখম করে। ৩নং আসামী মোঃ হারুন মিয়া (৫২) তার হাতে থাকা লাঠি দিয়ে আমাদের সাথে থাকা ক্র্যাব স্টাফ লাল মিয়াকে এলোপাতাড়িভাবে বাড়ি মেরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে নিলাফুলা জখম করে। ৪নং আসামী মোহাম্মদ আলী (২৪) এশিয়ান টিভির ক্রাইম চীফ সোহেল নয়নের নাকে-মুখে এলোপাতাড়ি মারধর করিয়া নিলাফুলা জখম করে। আমার সহকর্মী মহসিন কবিবেরর সাথে থাকা নগদ ৪ হাজার টাকা এবং তার সাথে থাকা ০১ টি মোবাইল ফোন আসামীরা নিয়ে যায়। একপর্যায়ে সকল আসামীগন তাদের হাতে থাকা লাঠি-সোঠা নিয়ে আমাদের ভাড়াকৃত বাসের সাইট গ্লাস ভেঙ্গে অনুমান ১০ হাজার টাকার ক্ষতিসাধন করে।
ফয়েজ এজাহারে আরো উল্লেখ করেন, আমাদের ত্র্যাব এর সদস্য ও পরিবারবর্গ নিয়ে বাসে উঠে ড্রিম হলিডে পাকের্র গেইটের কাছে অগ্রসর হলে আসামীরা বাসের চাবী কেড়ে নেয় এবং বাসে আগুন দিয়ে আমাদেরকে পুড়িয়ে মারবে বলে প্রকাশ্যে জীবননাশের হুমকি প্রদান করে। কিছুক্ষনের মধ্যেই মাধবদী থানা পুলিশ ঘটনার সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে আমার সনাক্তমতে উল্লিখিত ১ ও ২নং আসামীদ্বয়কে আটক করে তাদের হেফাজতে নেয়। অন্যান্য আসামীরা পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে কৌশলে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। আমাদের উপস্থিতিতে গ্রেফতারকৃত আসামীদ্বয়কে ঘটনার সময়ের ভিডিও ফুটেজ ও স্থির ছবি দেখিয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করিলে ঘটনার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত উল্লিখিত ৩ হতে ৮ নং আসামীদের নাম ঠিকানা প্রকাশ করে। অতঃপর আমাদের ক্র্যাবের সদস্যরা আমাকেসহ আমার আহত সহকর্মীদের উদ্ধার পূর্বক দ্রুত জেলা সদর হাসপাতাল নরসিংদী সহ ঢাকায় চিকিত্সার জন্য নিয়ে যায়। আমার অন্যান্য সহকর্মী জখমীরা ঢাকা সহ বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা গ্রহন করিতেছে।
Shamiur Rahman
