পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি, শত কোটি টাকার মালিক জাহিদ

Published: 12 August 2024 23:08

বর্তমানে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ রয়েছে। এতে আনন্দে রয়েছে চালকরা। চালকদের দাবি সারা বছর কেউ যেন ড্রাইভারদের জিম্মি করে আর চাঁদা নিতে না পারে

মানিকগঞ্জের পরিবহণ খাত থেকে চাঁদাবাজি করে শত কোটি টাকার মালিক বনে যান পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম ওরফে কালা জাহিদ। চায়ের দোকানে কর্মচারী থেকে তার এই উত্থান। রয়েছে একাধিক আলিসান বাড়ি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহিদ ১৯৯৬ সালের আগে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে একটি চায়ের দোকানের কর্মচারী ছিলেন। তিনি এরপর ১৯৯৬ সালের দিকে কিছুদিন বিএনপির রাজনীতি করেন। এরপর জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। পরে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের প্রত্যক্ষ মদদে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগদান করেন। এরপর তিনি জাহিদ মালেকের আস্থাশীল হয়ে পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বনে যান।

সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের ইচ্ছায় ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম মানিকগঞ্জ বাস টার্মিনালসহ মালিক সমিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিজেকে সভাপতি ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে জেলার বাস, মিনিবাস, মাইক্রোবাস, অটো-টেম্পো ওনার্স গ্রুপ দখল করে জাহিদুল ইসলাম চাঁদাবাজির নেতৃত্ব দেন।

জাহিদুল ইসলাম জাহিদ তার নিজস্ব ভাই ভাতিজা দিয়ে তৈরি করেন চাঁদাবাজির একটি সিন্ডিকেট। তার নেতৃত্বে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের দোকানপাট থেকে নিয়মিত চাঁদা নেয়া হতো। চাঁদাবাজির সঙ্গে সঙ্গে টেন্ডারবাজি, স্থানীয় এলাকায় জমি দখলসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দিতেন।

মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে মালিক সমিতির নামে প্রতিদিন তিনি ৫ শতাধিক পরিবহণ থেকে মাসে অর্ধ কোটি টাকা চাঁদা নিতেন।

জাহিদুল ইসলাম জাহিদ জেলা পরিবহণ মালিক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাকে আর পেছন দিকে তাকানোর সময় ছিল না। রাতারাতি বনে যান কোটিপতি। তার বর্তমানে মানিকগঞ্জ রয়েছে ২টি বিলাসবহুল বাড়ি। তিনি তার জয়রা গ্রামে করেছেন একটি ৩ তলাবিশিষ্ট অত্যাধুনিক মডেলের বিলাসবহুল বাড়ি। মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে গড়ে তুলেছেন ৩ তলা একটি ভবন। যার নাম দিয়েছেন জাহিদ টাওয়ার।

এছাড়া তার সাভারে রয়েছে একটি বাড়ি। সাভার উপজেলার বিপরীতে ১২ শতাংশ জায়গা রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া তার চলাচলের জন্য রয়েছে এক্সিয়াস ব্রান্ডের দামি গাড়ি। শুভযাত্রা নামক ২টি মিনিবাস। গত ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে জাহিদের বাসস্ট্যান্ডের জাহিদ টাওয়ার ভাঙচুর করা হয়েছে।

আরও জানা গেছে, জাহিদুল ইসলাম জাহিদের নেতৃত্বে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে পরিবহণ থেকে চাঁদা এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন জাহিদের আপন ভাই মাহিদুল ইসলাম মাহিদ, জাহিদের বড় ভাই জসিম, ভাতিজা জকি, জাহিদের চাচা টিটু, আরেক চাচা আব্দুল হালিম, জাহিদের চাচাতো ভাই সবুজ, আরেক চাচাতো ভাই আকতার এরা সরাসরি চাঁদাবাজি করতেন।

গত ২০২২ সালে গোয়েন্দা সংস্থা জাহিদুল ইসলাম জাহিদের চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে একটি তদন্ত রিপোর্ট দেন; কিন্তু এরপরও মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের পরিবহণ থেকে চাঁদা বন্ধ হয়নি।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পর প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করার পর থেকে জাহিদুল ইসলাম জাহিদও পলাতক রয়েছেন। বর্তমানে জাহিদ পলাতক থাকার কারণে পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ রয়েছে।

স্থানীয়রা বলেন, জাহিদ বর্তমানে অনেক বড়লোক। তিনি কয়েক বছর ধরে বড়লোক হয়েছেন। তার আপন ভাইদের কিন্তু এত টাকাপয়সা নেই।

তথ্য সংগ্রহে সরেজমিন জাহিদুল ইসলাম জাহিদের জয়রা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তিনি অল্প কিছুদিন আগে ৩ তলা একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন। সেই বাড়িতে বর্তমানে জাহিদ নেই। অপরদিকে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডের জাহিদ টাওয়ার বর্তমানে ভাঙচুর অবস্থায় রয়েছে। এর আগে জাহিদ টাওয়ারের ২য় তলায় জাহিদুল ইসলামের ব্যক্তিগত অফিস ছিল। জাহিদুল ইসলাম জাহিদ জয়রা বাড়ি এবং বাসস্ট্যান্ডের জাহিদ টাওয়ারে তাকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা জানান জাহিদ বর্তমানে পলাতক রয়েছে।

মানিকগঞ্জের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা ওমর ফারুক বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে পরিবহণ খাতে প্রচুর চাঁদা আদায় হয়েছে। আমরা জানি। ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে আমরা বর্তমান সরকারের কাছে চাঁদাবাজ এবং অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাব।

বর্তমানে মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ রয়েছে। এতে আনন্দে রয়েছে চালকরা। চালকদের দাবি সারা বছর কেউ যেন ড্রাইভারদের জিম্মি করে আর চাঁদা নিতে না পারে।

Shamiur Rahman

Related