গণতন্ত্রের পথে ধৈর্যের প্রহরা
উত্তেজনার মুহূর্তে আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া দেখানো সহজ; কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্থিতি বজায় রাখতে নীরব, স্থির ও শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকা অনেক কঠিন—যা সবাই পারে না
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট—তারিখটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সেই সময় থেকে শুরু করে পরবর্তী দিনগুলোতে দেশজুড়ে ছিল নানা জল্পনা, শঙ্কা ও উত্তেজনা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইউটিউবভিত্তিক কিছু ব্যক্তিগত চ্যানেলে প্রতিনিয়ত ছড়ানো হয়েছে অর্ধসত্য, অতিরঞ্জন ও ভিত্তিহীন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব।
কেউ সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছে, কেউ বলেছে প্রতিষ্ঠানগুলো বিভক্ত, কেউ আবার অদূর ভবিষ্যতের ভয়াবহ চিত্র এঁকে ভিউ ও সাবস্ক্রাইবার বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
এই ‘ভিউ ব্যবসা’ নতুন কিছু নয়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম জানে—ভয়, উত্তেজনা ও সন্দেহ দ্রুত ছড়ায়। তাই কতিপয় প্রবাসী কনটেন্ট নির্মাতা দায়িত্বশীলতার চেয়ে চাঞ্চল্যকে বেছে নিয়েছেন। তাদের ভাষা ছিল উত্তেজনামূলক, বিশ্লেষণ ছিল পক্ষপাতদুষ্ট, আর উদ্দেশ্য ছিল জনমনে অবিশ্বাস সৃষ্টি করা।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে সেনাবাহিনীকে কেন্দ্র করে নানা অপপ্রচার বারবার চালানো হয়েছে—যার অনেকটাই ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, অনুমাননির্ভর ও যাচাইহীন। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট—গুজবের চাপে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় না; পরিচালিত হয় সংবিধান ও দায়িত্ববোধে।
৫ই আগস্ট-পরবর্তী অস্থিরতা থেকে শুরু করে আজকের নির্বাচন পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়টিতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সেনাবাহিনী যে অবস্থান নিয়েছে, তা ছিল সংযম, প্রজ্ঞা ও পেশাদারিত্বের এক পরীক্ষিত উদাহরণ।
উত্তেজনার মুহূর্তে আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া দেখানো সহজ; কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্থিতি বজায় রাখতে নীরব, স্থির ও শৃঙ্খলাবদ্ধ থাকা অনেক কঠিন—যা সবাই পারে না।
নির্বাচনকালীন সময়ে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাদের কাজ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ নয়; বরং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা।
এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে যে ধৈর্য প্রয়োজন, তা কেবল প্রশিক্ষণে নয়—নেতৃত্বের মানসিক দৃঢ়তার ওপর নির্ভর করে। সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহে দেখা গেছে, বাহিনীকে সংবিধানসম্মত দায়িত্বে সীমাবদ্ধ রেখে পেশাদার আচরণ নিশ্চিত করার চেষ্টা ছিল সুস্পষ্ট।
অপপ্রচারকারীরা বারবার এমন এক চিত্র তুলে ধরতে চেয়েছে যেন রাষ্ট্রের ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করেছে তাদের নিজ নিজ সীমারেখার ভেতরে। অনলাইন জগতে যতই সন্দেহ উসকে দেওয়া হোক, মাঠপর্যায়ে দায়িত্বশীল আচরণই স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করেছে।
সমালোচনা গণতন্ত্রের প্রাণ; কিন্তু অপপ্রচার গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। যারা তথ্য যাচাই ছাড়া আতঙ্ক ছড়ায়, তারা হয়তো সাময়িক জনপ্রিয়তা পায়; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা হারায়। অন্যদিকে, যারা নীরবে দায়িত্ব পালন করে, ইতিহাস তাদের মূল্যায়ন করে সময়ের পরিসরে।
আজকের নির্বাচন সেই সময়েরই একটি পরিণতি—যেখানে বহু শঙ্কা ও অপপ্রচার সত্ত্বেও প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে। এর কৃতিত্ব কোনো একক ব্যক্তির নয়; এটি সমষ্টিগত প্রচেষ্টার ফল। তবে নেতৃত্বের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। সেনাপ্রধান ও তাঁর বাহিনীর সংযমী অবস্থান, শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্ব এই সময়টিকে তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক হয়েছে।
তাই এই দৃঢ় ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে এই কথা বলা অতিরঞ্জন নয় যে -- রাষ্ট্রের শক্তি শব্দে নয়, কাঠামোয়; আবেগে নয়, দায়িত্বে।
৫ই আগস্ট থেকে আজ পর্যন্ত পথচলায় যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা হলো—গুজবের ঝড় যত প্রবলই হোক, সংযমী নেতৃত্ব ও পেশাদার বাহিনী থাকলে রাষ্ট্র তার পথ খুঁজে নেয়।
গণতন্ত্রের পথে যাত্রায় ধৈর্য ও সহনশীলতা অপরিহার্য, কারণ এটি কোনো মসৃণ প্রক্রিয়া নয়। স্বৈরতন্ত্র থেকে গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে মতবিরোধ নিষ্পত্তিতে ধৈর্যের কোনো বিকল্প নেই। গণতান্ত্রিক রূপান্তরে সব পক্ষকে ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় মনোযোগ দিতে হবে।
বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক যুক্তি, শৃঙ্খলা ও সংবিধানের আলোয়। আর আজকের নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি বা জামায়াত—যে জোটই সরকার গঠন করুক—তাদের উচিত হবে প্রজ্ঞা, পরমতসহিষ্ণুতা ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়া।
লেখক একজন নীতি বিশ্লেষক, উন্নয়ন গবেষক ও সমাজকর্মী
Shamiur Rahman
