২৪-এর পর রাজনীতির বাস্তবতা ও ‘ইন্টারভিউ আতঙ্ক’
জামায়াত ও ইসলামি চরমপন্থার ছত্রছায়ায় কিছু বামধারার দল ও ব্যক্তিবর্গের অঘোষিত সহাবস্থানই শেখ হাসিনা সরকারের পতনে বাস্তব ভূমিকা রেখেছিল
শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নিয়ে সাংবাদিক খালেদ মহিউদ্দীনের নাম হঠাৎ আলোচনায় উঠে এসেছে। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী—তা তিনি ক্ষমতাচ্যুত হোন বা না হোন—তার সাক্ষাৎকার নেওয়া সাংবাদিকতার একেবারেই স্বাভাবিক কাজ। কিন্তু সেই সাধারণ পেশাগত পদক্ষেপকেও ঘিরে এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া যেন শেখ হাসিনা কোনো আন্তর্জাতিক অপরাধী বা আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিম!
আসলে এখানে প্রতিক্রিয়ার মূল কারণ সাংবাদিকতার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক। যারা নিজেদের ‘গণঅভ্যুত্থানের শরিক’ বলে দাবি করছেন, তারা এখন বাস্তবতার মাটিতে নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছেন না।
২০২৪ সালের সরকার পতনের কৃতিত্ব যারা নিতে চেয়েছিলেন—তারা মূলত জনসমর্থনের বিচারে প্রান্তিক গোষ্ঠী। জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরেই দেশে গড়ে ৫ শতাংশের বেশি ভোট পায় না। সেই জামায়াত ও ইসলামি চরমপন্থার ছত্রছায়ায় কিছু বামধারার দল ও ব্যক্তিবর্গের অঘোষিত সহাবস্থানই শেখ হাসিনা সরকারের পতনে বাস্তব ভূমিকা রেখেছিল।
বিএনপি সেই সময়ের আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত ছিল না; বরং ৫ই আগষ্টে সামরিক হস্তক্ষেপের পর তারা রাজনৈতিক ফায়দা তুলেছে। একইভাবে সাকী বা ফুয়াদের মতো ক্ষুদ্র রাজনৈতিক সংগঠনও সেই তরঙ্গে চড়ে নিজেদের প্রাসঙ্গিক রাখার চেষ্টা করেছে। ফলে, ২৪-এর আন্দোলন বলে যেটিকে প্রচার করা হচ্ছে, তার কোনো সংগঠিত রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নেই।
এই আন্দোলনের কোনো শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ছিল না, নেইও। বিএনপি পরিস্থিতি অনুকূলে পেলেই এই ইস্যুকে ইতিহাসের ডাস্টবিনে ফেলে দেবে—এতে সন্দেহ নেই।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগপন্থীরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করেছে রাজাকার-আলবদর উত্তরাধিকারী শক্তি। সেই জায়গা থেকে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ নাগরিক এই ঘটনাকে কোনো ‘বিপ্লব’ নয়, বরং ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে বিএনপি-সমর্থিত সাধারণ জনগণের চোখে ২৪-এর ঘটনা কেবল ‘একটি সরকারের পতন’—এর বেশি কিছু নয়। তারা মনে করে, নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের দল আবার ক্ষমতায় ফিরলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
ফলে দেখা যাচ্ছে, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষই ২৪-কে কোনো আদর্শিক, চেতনা-নির্ভর রাজনৈতিক মোড় হিসেবে দেখছে না। এটা কোনো গণবিপ্লব নয়—এটা ছিল কেবল ক্ষমতার ভারসাম্য বদলের এক মুহূর্ত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেটওয়ার্ক, কিছু লেখক-কবি, এনজিও ও তথাকথিত সুশীল সমাজ—এরা মূলত দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের প্রতি ব্যক্তিগত ও আদর্শিক বিরাগ পোষণ করে এসেছে। মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতি ও আওয়ামী লীগের ঐতিহ্য তাদের কাছে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করে।
২৪-এ তারা ভেবেছিল, এই সুযোগে আওয়ামী লীগ নামক প্রতিষ্ঠানটিকে পুরোপুরি ইতিহাসের পাতায় ঠেলে দেবে। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের আভাস পেয়ে এই গোষ্ঠী ভয় পাচ্ছে নিজেদের অস্তিত্ব হারানোর আশঙ্কায়।
তাদের আতঙ্কই এখন প্রকাশ পাচ্ছে শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকারকে ঘিরে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ায়। শহীদের রক্ত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা—এসব শব্দ তারা এখন ব্যবহার করছে আত্মরক্ষার ঢাল হিসেবে। বাস্তবে, তারা ভয় পেয়েছে—কারণ ক্ষমতার সমীকরণ আবার পাল্টে যাচ্ছে।
Shamiur Rahman
