ঈদের দিনেও আমার সন্তানকে কোলে নিতে দেয়নিঃ টুকু

Published: 01 February 2026 14:02

তিনি বলেন, আমি জানালার এপাশে, ওরা অন্যপাশে। আমার বাচ্চাটা জানালার নেট ধরে আমার হাত ছোঁয়ার চেষ্টা করছিল। একবার কোলে নেব সেই সুযোগটুকুও তারা দেয়নি

বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু দীর্ঘ জেলজীবনের বেদনাবিধুর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ঈদের দিন আমার দেড় বছরের সন্তানকেও কোলে নিতে দেওয়া হয়নি। উপরন্তু আমার পরিবারের সঙ্গে অমানবিক, নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে।

সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, আমরা সবাই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শিক পরিবারের সদস্য। গত ১৫ থেকে ১৭ বছর ধরে আমরা ভোট দিতে পারিনি, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। ২০১৪ সালে ভোট দিতে পারিনি, ২০১৮ সালে নির্বাচনে এলেও দিনের ভোট রাতে হয়ে গেছে। আমাদের সবাইকে জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমি ও আমার পরিবার তারপরও বিএনপির হাল ছাড়িনি। আমাদেরকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়েছে। রাজনীতি ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে।

নিজের কারাবাসের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, হঠাৎ করে আমাকে মুন্সিগঞ্জ কারাগারে নেওয়া হয়। সেখানে কারও সঙ্গে দেখা করার সুযোগ ছিল না। একেবারে নির্জন একটি কক্ষে রাখা হয়েছিল- যেখান থেকে বারান্দা তো দূরের কথা, আকাশও দেখা যেত না। সারাক্ষণ সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি চলত, কাউকে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হয়নি। ৫০ বার শুধু রিমান্ডে আনা হয়েছে। একেকটা রিমান্ডে লম্বা সময় পুলিশ হেফাজতে রেখে নির্মমভাবে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে। আমার আত্মচিৎকারে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। তবুও হাসিনার পুলিশ বাহিনী আমাকে লাঠির আঘাত ও বৈদ্যুতিক শর্ট দিয়েছে। টুকু এসব হৃদয় বিদারক কথা গুলো বলার সময় তার দু'চোখের পানি ছলছল করে পড়ছিল।

সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতি স্মরণ করে কণ্ঠ ভারী করে টুকু বলেন, ঈদের দিন আমার সহধর্মিণী দেড় বছরের সন্তানকে নিয়ে দেখা করতে এসেছিল। আমি ছয় মাস বয়সে ওকে রেখে গিয়েছিলাম। তখন আমি প্রায় ১৮ মাস ধরে কারাগারে, চারটি ঈদ জেলে কাটিয়েছি। সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল। তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পর আমাকে গেটের সামনে নেওয়া হয়। সবাই যেখানে ঈদেরদিন সামনাসামনি দেখা করতে পারে, সেখানে আমাকে সে সুযোগ দেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, আমি জানালার এপাশে, ওরা অন্যপাশে। আমার বাচ্চাটা জানালার নেট ধরে আমার হাত ছোঁয়ার চেষ্টা করছিল। একবার কোলে নেব সেই সুযোগটুকুও তারা দেয়নি।

টুকু আরও বলেন, আমাদের ওপর সীমাহীন নির্যাতন চালানো হয়েছে। একদিন রিমান্ডে থাকা কষ্টের হলেও আমাকে টানা ৪৬ দিন রিমান্ডে রাখা হয়েছে। ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আমাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ছয় বছর কারাবরণ করতে হয়েছে। দুই হাজারের বেশি নেতাকর্মী গুম হয়েছেন, অসংখ্য মানুষ কারাগারে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

টুকু বলেন, এই ১৭ বছরে ৬০ হাজারের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। রাতে কেউ বাড়িতে ঘুমাতে পারেনি; কেউ ধানক্ষেতে, কেউ পাটক্ষেতে, কেউ বিলের মধ্যে, কেউ গাছের ওপর রাত কাটিয়েছে। অনেকেই মায়ের জানাজায় যেতে পারেনি। আমার বড় ভাই আব্দুস সালাম পিন্টুকেও মায়ের জানাজায় যেতে দেওয়া হয়নি। অনেক নেতাকর্মীকে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে জানাজায় নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, অগণিত শহীদের রক্তের বিনিময়ে, দেশনায়ক তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই দেশে আবার ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের বিদায় হয়েছে। এত ত্যাগের পর আমরা একটি নির্বাচন আদায় করতে পেরেছি। সেই ভোট আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি।

টুকু বলেন, এই ভোট কি আমরা হেলাফেলা করে হারাতে পারি? যে প্রতীকে আমি নির্বাচন করছি, সেটি আমার ব্যক্তিগত নয়। এই মার্কা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও দেশনায়ক তারেক রহমানের। বিএনপির প্রতিটি নেতাকর্মীর মার্কা ধানের শীষ। তিনি আরও বলেন, ১৭ বছর পর যারা আজ এই মার্কায় ভোট দিতে পারবেন না, তাদের চেয়ে দুর্ভাগা আর কেউ হতে পারে না।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে বিএনপির এই কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, আগামীর টাঙ্গাইল হবে আধুনিক ও নিরাপদ টাঙ্গাইল- যেখানে সন্ত্রাস, মাদক, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের কোনো স্থান থাকবে না। দলমত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করবে সেই লক্ষ্যেই সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

টুকু বলেন, আমি এমপি হলে টাংগাইল সিটি কর্পোরেশন হবে। যমুনা নদীর তীরবর্তী চলাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বেরিবাধ নির্মাণ হবে। একই সঙ্গে মাহমুদ নগর ও কাশিনগর এলাকায় দু'টি ব্রীজ হবে। ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা করা হবে। টাঙ্গাইলে অত্যাধিক হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে। সাদ'ত বিশ্ববিদ্যালকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তরিত করা হবে।

সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, আমার নেতা তারেক রহমান টাঙ্গাইলের শাড়ি ও টুপি বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রে রপ্তানি করার কথা বলেছেন। এটি অবশ্যই টাঙ্গাইলবাসীর জন্য একটি সুখবর। আমি ১২ ফেব্রুয়ারী ধানের শীষ প্রতীকে পাশ করে সংসদে যাবার সুযোগ হলে গুরুত্বসহকারে শাড়ি ও টুপির ব্যবসায়ীদের সার্বিক সহযোগিতা করব।

Shamiur Rahman

Related