কৃষকের ঘামে ভরে ওঠা খাদ্যভান্ডার অনিশ্চয়তায়
আলুক্ষেতে বৃষ্টি, কৃষকের আর্তনাদ ও রাষ্ট্রের দায়
উত্তরবঙ্গের ডুবে যাওয়া আলুখেত শুধু একটি মৌসুমি বিপর্যয় নয়; বরং এটি আমাদের কৃষি পরিকল্পনা, বাজারব্যবস্থা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে
কৃষকের ঘামেই দেশের খাদ্যভান্ডার ভরে ওঠে—এই সত্য নতুন নয়। কিন্তু সেই ঘাম যদি বারবার লোকসানের জলে ধুয়ে যায়, তাহলে শুধু কৃষক নয়, পুরো খাদ্যব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়ে। সম্প্রতি উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় আকস্মিক ভারী বৃষ্টিতে আলুখেতের ব্যাপক ক্ষতি সেই ঝুঁকিরই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
উত্তরবঙ্গের ডুবে যাওয়া আলুখেত শুধু একটি মৌসুমি বিপর্যয় নয়; বরং এটি আমাদের কৃষি পরিকল্পনা, বাজারব্যবস্থা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
উৎপাদন কেন্দ্রের দুর্ভোগ ও বাজারের অসাম্য
বাংলাদেশে আলু একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। ধানের পরেই এর অবস্থান। উত্তরবঙ্গ—বিশেষ করে রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া অঞ্চল—দেশের আলু উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। কিন্তু অকাল বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার কারণে হাজার হাজার হেক্টর জমির আলু নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতি কৃষকদের জন্য চরম আর্থিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।
মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কৃষকের আর্থিক ক্ষতিকে আরও গভীর করে। আলুচাষিরা প্রায়ই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন, আর ফড়িয়া ও আড়তদাররা মজুদ করে পরে বেশি দামে বাজারে বিক্রি করেন। ফলে লাভের বড় অংশ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।
আইনগত ও নীতিগত হস্তক্ষেপের প্রয়োজন
সরকারকে বাজারে ন্যায্যতা বজায় রাখতে কার্যকর আইন এবং তদারকি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। নির্দিষ্ট সীমার বেশি মজুদ বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে কঠোর শাস্তি দেওয়া জরুরি।
কৃষকদের সরাসরি বাজারে বিক্রির সুযোগ বাড়াতে ‘ফার্মারস মার্কেট’ চালু করা যেতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কৃষক-ভোক্তা সংযোগ স্থাপন করলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো সম্ভব।
সরকারি বা সমবায় ভিত্তিক কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে কৃষক তাৎক্ষণিক বিক্রির চাপ থেকে মুক্ত থাকবেন।
চুক্তিভিত্তিক কৃষি আইনগতভাবে সুরক্ষিত করা গেলে কৃষক নির্দিষ্ট মূল্যে বিক্রির নিশ্চয়তা পেতে পারেন। ভারত ও থাইল্যান্ডে এই মডেল সফল হয়েছে। বাংলাদেশেও এই কাঠামো শক্তিশালী করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব সীমিত হবে।
প্রক্রিয়াজাত শিল্প ও রপ্তানির সুযোগ
বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আলু উৎপাদিত হলেও এর বড় অংশ নষ্ট হয় বা কম দামে বিক্রি হয়। শক্তিশালী প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তোলা হলে যেমন আলুচিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বা স্টার্চ উৎপাদন, অতিরিক্ত উৎপাদন সহজেই ব্যবহৃত হতে পারত।
নেদারল্যান্ডসের উন্নত প্রক্রিয়াজাত শিল্প কৃষকদের জন্য স্থিতিশীল বাজার তৈরি করেছে। রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগও রয়েছে। পাকিস্তান ও ভারত নিয়মিতভাবে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আলু রপ্তানি করে। বাংলাদেশও এই বাজারে প্রবেশ করতে পারে, যদি মান নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় উন্নতি আনা যায়।
কৃষি বিভাগের দায়বদ্ধতা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা
অকাল বৃষ্টিপাত বা আবহাওয়ার পরিবর্তন আর অপ্রত্যাশিত নয়—এটি একটি নতুন বাস্তবতা। কৃষি বিভাগকে আগাম সতর্কতা, পরামর্শ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ:
• আবহাওয়া পূর্বাভাসের ভিত্তিতে কৃষকদের সময়মতো ফসল তোলার নির্দেশনা
• পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং খাল পুনঃখনন
• জলাবদ্ধতা সহনশীল ফসলের জাতের উন্নয়ন
জাপানে কৃষকদের জন্য মোবাইল ভিত্তিক আবহাওয়া তথ্য সরাসরি পৌঁছে যায়। বাংলাদেশেও ডিজিটাল কৃষি সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে এই ধরনের ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি বীমা
অনেক দেশেই কৃষি বীমা চালু রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলে কৃষক ক্ষতিপূরণ পান। বাংলাদেশে এই ব্যবস্থা সীমিত পর্যায়ে থাকায় কৃষক আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েন। পূর্ণাঙ্গ কৃষি বীমা চালু করা গেলে ক্ষতির প্রভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
জাতীয় বাজেট ও কৃষকের অধিকার
কৃষি একটি ঝুঁকিপূর্ণ খাত। জাতীয় বাজেটে কৃষি ও কৃষকের ভর্তুকি কেবল ঘোষণায় নয়, মাঠে বাস্তবতায় প্রতিফলিত হতে হবে। জরুরি তহবিল গঠন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য দ্রুত প্রণোদনা এবং কৃষি ঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে
উত্তরবঙ্গের ডুবে যাওয়া আলুখেত শুধু একটি অঞ্চলের দুর্ভাগ্য নয়; এটি পুরো কৃষি ব্যবস্থার জন্য সতর্কবার্তা। ভর্তুকি বাড়ানো, ন্যূনতম সহায়ক মূল্য কার্যকর করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর কঠোর আইন প্রয়োগ, প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কৃষককে সরাসরি বাজারে প্রবেশের সুযোগ—সবই এখন সময়ের দাবি।
বাজেটের প্রতিটি সংখ্যায়, প্রতিটি নীতিতে একটাই প্রশ্নের উত্তর থাকতে হবে: কৃষক কি বাঁচছেন ? যদি উত্তর ‘না’ হয়, খাদ্য নিরাপত্তা ও দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ একদিন ভেঙে পড়বে। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে—এই সত্যই রাষ্ট্রের নীতিতে জোরালোভাবে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
লেখক একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট, সমাজকর্মী, উন্নয়ন সংগঠক ও নীতি বিশ্লেষক
Shamiur Rahman

Please share your comment: