শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হকের সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য পুনরায় খোলার ইঙ্গিত
বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মন্ত্রী পর্যায়ে একটি নীতিনির্ধারণী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো অগ্রাধিকার পায়।
বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী রামানান রামাকৃষ্ণ এবং বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এই বৈঠকে নিজ নিজ দেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন।
দ্বিপাক্ষিক এই বৈঠকে আরিফুল হকের সঙ্গে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন এবং মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম চৌধুরী।
বৈঠকের আগে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান। তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতার প্রশংসা করেন। বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে উল্লেখ করেন ত
এসময় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বার্তা পৌঁছে দেন এবং একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি হস্তান্তর করেন, যেখানে দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।
শ্রমবাজার চালু ও জনশক্তি ব্যবস্থাপনা
দুই মন্ত্রীর বৈঠকে অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু এবং জনশক্তি ব্যবস্থাপনা। মালয়েশিয়ায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী নিয়োজিত থাকায় এই খাতটি দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
বৈঠকে উভয় পক্ষই শ্রমিকদের সুরক্ষা, ন্যায্য মজুরি এবং উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে। বিশেষ করে মধ্যস্বত্বভোগী দালালচক্রের দৌরাত্ম্য কমিয়ে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে উভয় দেশ তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে। সেই সঙ্গে খাতভিত্তিক চাহিদার ভিত্তিতে দ্রুত শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে নীতিগত সম্মত হয়।
প্রযুক্তিনির্ভর নিয়োগ পদ্ধতি
আজকের গুরুত্বপূর্ণ এই আলোচনায় প্রযুক্তিনির্ভর নিয়োগ পদ্ধতি চালুর বিষয়টি গুরুত্ব পায়। মালয়েশিয়া একটি ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-ভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ তুলে ধরে, যার মাধ্যমে দালাল নির্ভরতা কমানো, অভিবাসন ব্যয় হ্রাস ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এই ব্যবস্থার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ‘নিয়োগকর্তাই ব্যয় বহন করবে’ নীতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে। ফলে শ্রমিকদের জন্য নিয়োগ ব্যয় শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ এই উদ্যোগে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে।
মানবপাচার মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি
দ্বিপক্ষীয় এই বৈঠকে শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মানবপাচার সংক্রান্ত চলমান মামলাগুলো নিয়েও আলোচনা হয়। মালয়েশিয়া তাদের আন্তর্জাতিক সুনাম ক্ষুণ্ণ করতে পারে এমন ভিত্তিহীন বা বিদ্বেষপূর্ণ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের ওপর জোর দেয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশ আইনের শাসন, জবাবদিহি ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে।
বৈঠকে উভয়পক্ষ দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, সনদ প্রদান এবং তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে জনশক্তির সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন। এর মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ
বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়। তথ্যপ্রযুক্তি, উৎপাদন শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হালাল শিল্পে যৌথ বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়। এসময় মালয়েশীয় বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে আকৃষ্ট করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়।
বৈঠকে মালয়েশিয়ার ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশের উদীয়মান ডিজিটাল অর্থনীতি এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশী প্রতিনিধিরা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং অবকাঠামো প্রকল্পে মালয়েশীয় বিনিয়োগের সুযোগগুলো তুলে ধরেছেন। এসময় তারা দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বানিজ্য বছরে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন
শিক্ষা ও দক্ষতা প্রশিক্ষণে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা প্রসারিত হয় এবং উভয় দেশই মানবসম্পদ উন্নয়নের কৌশলগত গুরুত্ব স্বীকার করে।
এছাড়া, শিক্ষা খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থী বিনিময়, যৌথ গবেষণা ও কারিগরি বৃত্তির কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে জ্ঞান ও দক্ষতা বিনিময়ের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ইতিবাচক গতি
উভয় দেশের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের ঊর্ধ্বমুখী প্রবনতায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রম ও শিক্ষা খাতে সহযোগিতা ত্বরান্বিত করার অঙ্গীকার করেছে।
সম্মত কর্মপরিকল্পনাগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এসময় আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে সুবিধাজনক সময়ে মালয়েশিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানান। উভয় পক্ষ বৈঠকের ফলাফল নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে এবং ভবিষ্যতে শ্রম, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিক্ষা খাতে সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রত্যয় ব্যক্ত করে।
এই বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন বাংলাদেশ তার বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রকে বৈচিত্র্যময় করতে এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চাইছে। অন্যদিকে, মালয়েশিয়া নিয়ন্ত্রিত ও নৈতিক নিয়োগ পদ্ধতির মাধ্যমে প্রধান শিল্পখাতগুলোতে শ্রম ঘাটতি মোকাবেলার লক্ষ্য নিয়েছে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সংলাপের ফলস্বরূপ গৃহীত সুনির্দিষ্ট নীতিগত পদক্ষেপগুলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে এবং উভয় দেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করতে পারে।
Shamiur Rahman

Please share your comment: