‘দাতা ও আরসিটি-র প্রতি খোলা চিঠি

অন্তর্ভুক্তি বাছাই সাপেক্ষ হতে পারে না, 'লোকালাইজেশন’ও কোনো মিথ নয়’’

Published: 03 May 2026 17:05

আমি কেবল একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবে নয়, বরং কক্সবাজারের মাটিতে দাঁড়িয়ে কাজ করা স্থানীয় নাগরিক সমাজের একজন প্রতিনিধি হিসেবে এই চিঠি লিখছি—যে সমাজ সংকটের প্রথম দিন থেকে সামনে থেকেছে, অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে বারবার প্রান্তে ঠ

সম্মানিত দাতা ও আরসিটি সদস্যবৃন্দ,

আমি কেবল একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবে নয়, বরং কক্সবাজারের মাটিতে দাঁড়িয়ে কাজ করা স্থানীয় নাগরিক সমাজের একজন প্রতিনিধি হিসেবে এই চিঠি লিখছি—যে সমাজ সংকটের প্রথম দিন থেকে সামনে থেকেছে, অথচ সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে বারবার প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকে সমন্বয় কাঠামোর ভেতরে সক্রিয় থাকার অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট করে বলতে বাধ্য হচ্ছি: যে জায়গায় স্থানীয় কণ্ঠ হওয়া উচিত ছিল কেন্দ্রীয়, সেখানে পৌঁছাতেই আমাদের লড়াই করতে হয়েছে, বারবার দরজায় কড়া নাড়তে হয়েছে। এই বাস্তবতা শুধু বেদনাদায়ক নয়—এটি পুরো মানবিক ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

আপনাদের আসন্ন সভার আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ। নির্ধারিত নিয়ম মেনে আমি অনলাইনে পর্যবেক্ষক হিসেবে অংশ নেব—কথা বলব না, হাত তুলব না। তবে সভায় নীরব থাকা মানে নীতিগতভাবে নীরব থাকা নয়। কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ নথিভুক্ত করা জরুরি।

সম্প্রতি একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যে অর্থায়ন স্থানীয় সংস্থাগুলোকে শক্তিশালী করার কথা, তা ক্রমেই আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর দিকে যাচ্ছে। যাদের নিজ নিজ দেশ থেকে তহবিল আনার কথা ছিল, তারাই এখন কক্সবাজার থেকেই সংগৃহীত তহবিলের প্রধান অংশ পাচ্ছে। প্রশ্ন জাগে—এখানে ‘লোকালাইজেশন’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে?

পুলফান্ডের বণ্টন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বড় অংশ চলে যাচ্ছে জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর কাছে, আর বাকি অংশের বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক সংস্থার দখলে। স্থানীয় এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ প্রায় অদৃশ্য—কোথাও স্পষ্ট প্রতিযোগিতা নেই, নেই স্বচ্ছতা। এতে একদিকে সক্ষম স্থানীয় সংগঠনগুলো বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে পুরো ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমছে।
‘লোকালাইজেশন’ নিয়ে যে প্রচারণা চালানো হচ্ছে, বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। বৈশ্বিক অঙ্গীকারে স্থানীয়দের ক্ষমতায়নের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন নেই।

এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগ জানালেও সাড়া না পাওয়া—উপেক্ষার অনুভূতিকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতেও স্থানীয় অংশগ্রহণ সীমিত। পরিবেশ সুরক্ষা, স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর অধিকার, টেকসই আশ্রয়—এসব বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানানো হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রবেশাধিকার মেলেনি।

একই সময়ে, অনেক কার্যক্রম গোপনীয়ভাবে পরিচালিত হচ্ছে—যা জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এখানে স্থানীয় নাগরিক সমাজ বলতে শুধু এনজিও বোঝায় না—স্থানীয় সরকার এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাও এর অংশ। অথচ দাতা ও নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ খুবই সীমিত, যা পুরো প্রক্রিয়ার বৈধতাকেই দুর্বল করে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, অর্থায়ন ক্রমেই কয়েকটি নির্দিষ্ট সংস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকটে এ ধরনের কেন্দ্রীভূত পদ্ধতি টেকসই বা ন্যায্য—কোনোটিই নয়। মানবিক সহায়তা হতে হবে উন্মুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক।

২০১৭ সালের প্রথম ৪০ দিন মনে করা জরুরি। তখন স্থানীয় মানুষ ও নাগরিক সমাজই সবার আগে এগিয়ে এসেছিল—স্বল্প সম্পদে দ্রুত ও কার্যকর সেবা দিয়েছে। সেই অবদানকে উপেক্ষা করা যায় না, করা উচিতও নয়।

আমরা দাতাদের প্রতি আহ্বান জানাই—স্থানীয় নাগরিক সমাজের সঙ্গে সরাসরি ও কাঠামোবদ্ধ সংলাপ শুরু করুন। অন্তর্ভুক্তি যেন কেবল প্রতীকী না হয়, ‘লোকালাইজেশন’ যেন কেবল কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।

সশ্রদ্ধ, বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে হলে এখনই পরিবর্তন দরকার। সহযোগিতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা হবে সমতার ভিত্তিতে—উপর-নিচ নয়, বরং প্রকৃত অংশীদারত্বের মাধ্যমে।

Shamiur Rahman

Please share your comment:

Related