ইতিহাস, জনশ্রুতি ও বিশ্বাস
শাহ সুলতান (রহ.) ও রাজবাড়ীর বেলগাছির দরগা
শাহ সুলতান (রহ.) ছিলেন তৎকালীন তুরস্ক সাম্রাজ্যের রাজপরিবারের একজন সদস্য। পার্থিব ক্ষমতা ও রাজকীয় জীবন ত্যাগ করে তিনি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে জন্মভূমি তুরস্ক থেকে সুদূর বাংলা নামের এই ভূখণ্ডে আগমন করেন
বাংলার মাটি শুধু নদী–খাল–ফসলের জন্যই নয়, সুফি সাধকদের পদচারণায়ও ইতিহাসে উজ্জ্বল। রাজবাড়ী জেলার বেলগাছি ইউনিয়নের হরিহরপুর গ্রামে অবস্থিত শাহ সুলতান (রহ.)–এর মাজার তেমনই এক স্মৃতি ও বিশ্বাসের কেন্দ্র। এই স্থানটি আজও স্থানীয়ভাবে “শাহ সুলতানের দরগা” নামেই পরিচিত।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, শাহ সুলতান (রহ.) ছিলেন তৎকালীন তুরস্ক সাম্রাজ্যের রাজপরিবারের একজন সদস্য। পার্থিব ক্ষমতা ও রাজকীয় জীবন ত্যাগ করে তিনি ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে জন্মভূমি তুরস্ক থেকে সুদূর বাংলা নামের এই ভূখণ্ডে আগমন করেন।
দীর্ঘ ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে তিনি বর্তমান বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার বেলগাছির হরিহরপুর এলাকায় এসে বসতি স্থাপন করেন—এমন বিশ্বাস স্থানীয় মানুষের মধ্যে বহু প্রজন্ম ধরে প্রচলিত।
আজ যে স্থানে মাজারটি অবস্থিত, সেখানে বহু বছর ধরে খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন মতি মোল্লা ও তাঁর পরিবার।
তাদের ভাষ্যমতে, বংশপরম্পরায় তারা এই দরগার দেখভাল করে আসছেন। এখানকার মানুষ এখনও নানা মনোবাসনা পূরণের আশায় মানত করে থাকেন। বিশেষত সন্তান লাভ, রোগমুক্তি কিংবা পারিবারিক সংকট নিরসনের আশায় অনেকেই এই দরগায় এসে দোয়া ও মানত করেন।
এদিকে, শাহ সুলতান (রহ.)–কে ঘিরে নানা অলৌকিক কাহিনি ও বিশ্বাস লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, যা এই স্থানকে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে।
তথ্যসূত্রে যতটুকু জানা যায়, শাহ সুলতান (রহ.) ছিলেন একাদশ শতাব্দীর একজন সুফি মুসলিম ব্যক্তিত্ব। অনেক ঐতিহাসিক ও গবেষকের মতে, তিনি ছিলেন বাংলায় আগত প্রাথমিক সুফিদের অন্যতম—এমনকি কেউ কেউ তাঁকে বাংলায় ভ্রমণ ও বসতি স্থাপনকারী প্রথম সুফি হিসেবেও উল্লেখ করেন।
তবে তাঁর পরিচয়, জীবনপথ এবং ঠিক কোন স্থানে তাঁর সমাধি—এই বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রাচীন নথিপত্র আজ আর পাওয়া যায় না। ফলে বেলগাছির হরিহরপুরে অবস্থিত মাজারটি যে নিশ্চিতভাবেই তাঁর কবর, সেই বিষয়ে চূড়ান্ত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন।
তবুও ইতিহাসের লিখিত প্রমাণ আর লোকবিশ্বাসের মধ্যবর্তী এক অঞ্চলে দাঁড়িয়ে শাহ সুলতান (রহ.)–এর নাম বহু শতাব্দী ধরে ইসলামের প্রচার ও সুফি আদর্শের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বাংলার সমাজে ইসলামের মানবিক, আধ্যাত্মিক ও সহনশীল রূপ গঠনে এই ধরনের সুফি সাধকদের ভূমিকা অস্বীকার করার উপায় নেই।
অতএব, শাহ সুলতান (রহ.)–এর মাজার শুধু একটি সমাধিস্থল নয়; এটি ইতিহাস, বিশ্বাস ও লোকসংস্কৃতির মিলনবিন্দু। লিখিত ইতিহাস হয়তো এখানে নীরব, কিন্তু মানুষের স্মৃতি, শ্রদ্ধা ও আস্থার মধ্য দিয়েই এই দরগা আজও জীবন্ত হয়ে আছে রাজবাড়ীর মাটিতে।
Shamiur Rahman
