রাষ্ট্রের মানবিক প্রতিশ্রুতি

নিহত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির ছেলে মেঘকে পূর্বাচলে জমি

Published: 22 August 2025 08:08

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজ বাসায় নির্মমভাবে খুন হন সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও তার স্ত্রী মেহেরুন রুনি

নিহত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির ছেলে মেঘকে পূর্বাচলে জমি: রাষ্ট্রের মানবিক প্রতিশ্রুতি

নিজস্ব প্রতিবেদক :২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে পুরো জাতি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। রাতারাতি এতিম হয়ে গিয়েছিল এক পাঁচ বছরের শিশু—মাহির সরওয়ার মেঘ। সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির হত্যার ক্ষত এখনো শুকোয়নি। সেই মেঘ আজ ১৮ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে পেল রাষ্ট্রের একটি মানবিক প্রতিশ্রুতি—পূর্বাচলে তিন কাঠা জমির দলিল। বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার হাতে এই দলিল তুলে দেন।

রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মেঘের ভবিষ্যৎ নিশ্চিতে উদ্যোগ

রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বাস্তবায়নে এই জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নিহত সাংবাদিক দম্পতির একমাত্র সন্তান মেঘ যেন একটি নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে, সেই লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম বলেন, “একটি শিশুর শৈশব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল ২০১২ সালে। আজ আমরা চাই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার পাশে দাঁড়াতে। এই জমি হস্তান্তর তার জীবনের অপূরণীয় ক্ষতির প্রতিদান দিতে না পারলেও, অন্তত ভবিষ্যতের জন্য তাকে কিছুটা ভরসা দেবে।”

উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম এবং রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম।

অতিথিরা সবাই এ উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও মানবিক বলে আখ্যা দেন। তারা বলেন, একজন সাংবাদিকের সন্তানকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নেওয়া কেবল সহমর্মিতা নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি সাংবাদিকদের অবদান স্বীকৃতিরও প্রতীক।

প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য: “রাষ্ট্রের দায় এড়ানো যায় না”

প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস দলিল হস্তান্তরের সময় বলেন, “আমরা মেঘকে তার বাবা-মায়ের মতো আদর, সুরক্ষা বা শৈশব ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের দায়িত্ব তার পাশে থাকা। সাংবাদিকরা সমাজের বিবেক। তাদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতেই আজকের এই পদক্ষেপ।”

তিনি আরও বলেন, “মেঘের জন্য আজকের এই জমি হয়তো তার অভিভাবকের শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। কিন্তু এটি তার জীবনে একটি নিরাপত্তার আশ্বাস হয়ে থাকবে।”

সাগর-রুনির নির্মম হত্যাকাণ্ড:

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারে নিজ বাসায় নির্মমভাবে খুন হন সাংবাদিক সাগর সরওয়ার ও তার স্ত্রী মেহেরুন রুনি। সাগর সরওয়ার তখন মাসিক টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক এবং রুনি ছিলেন এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। তাদের একমাত্র সন্তান মেঘ তখন ছিল মাত্র পাঁচ বছরের শিশু।

দশকের পর দশক পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত আজও সম্পন্ন হয়নি। বহুবার তদন্ত সংস্থা বদলানো হলেও আসল খুনিরা ধরা পড়েনি। এই অনিশ্চয়তা সাংবাদিক সমাজে এক গভীর ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে।

একজন সাংবাদিক বলেন, “আমরা বিচার পাইনি। তবে আজকের এই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে অন্তত বোঝা যাচ্ছে, সাগর-রুনি ভুলে যাওয়া মানুষ নন।”

মেঘ এখন প্রাপ্তবয়স্ক। পড়াশোনার পাশাপাশি সে শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গেও যুক্ত। অনেকেই বলেন, মেঘ শুধু নিহত সাংবাদিক দম্পতির নয়, পুরো সাংবাদিক সমাজের সন্তান। তার সাফল্য হবে সত্য ও ন্যায়ের প্রতি লড়াইয়ের এক প্রতীক।

অনুষ্ঠানে অতিথিরা মেঘকে উৎসাহ দেন যেন সে সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, “মেঘ শুধু একজন সন্তান নয়, সে পুরো জাতির প্রতীক। অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা তার মধ্য দিয়ে আমরা দেখতে পাই।”

এই জমি হস্তান্তরকে অনেকেই একটি মানবিক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন। রাষ্ট্র যখন একজন নিরপরাধ শিশুর ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে উদ্যোগ নেয়, তখন এটি সমাজে একটি ইতিবাচক বার্তা দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু মেঘের জন্য সহায়তা নয়; বরং সাংবাদিক সমাজের জন্য একটি স্বীকৃতি। সত্যের জন্য যারা কলম ধরেন, রাষ্ট্র তাদের পাশে আছে—এই বার্তাই উঠে এসেছে এ ঘটনায়।

যদিও জমি হস্তান্তর মেঘের ভবিষ্যতের জন্য এক ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবু সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনও অনিশ্চয়তায়। সাংবাদিক সমাজের দাবি, যতদিন প্রকৃত খুনিদের শাস্তি না হবে, ততদিন এই ক্ষত শুকোবে না।

একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের ভাষায়, “মেঘের ভবিষ্যতের নিরাপত্তা আমাদের সবার কাম্য। কিন্তু তার বাবা-মায়ের হত্যার বিচার ছাড়া আমাদের দায় শেষ হয় না।”

সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশে সাংবাদিক নিরাপত্তাহীনতার এক নির্মম স্মৃতি। সেই হত্যাকাণ্ডে অনাথ হওয়া মেঘকে আজ রাষ্ট্র যে হাতে তুলে নিল, তা একটি আশার বার্তা বটে। তবে একইসঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা—এই হত্যাকাণ্ডের ন্যায়বিচারও শিগগিরই নিশ্চিত হবে।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার অনুষ্ঠানটি তাই কেবল একটি দলিল হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি মানবিকতা, দায়বদ্ধতা ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রতি রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতির প্রতীক হয়ে রইল।

Shamiur Rahman

Related