নারীর সামনে ধমক, পেছনে কুৎসা—সমাজের দ্বিমুখী মুখোশ

Published: 09 December 2025 15:12

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে পুরুষত্বের একটি মুখোশ তৈরি হয়েছে—যেখানে শক্তির প্রকাশ হয় ধমক, উচ্চস্বরে কথা বলা, কিংবা নারীর আত্মবিশ্বাসকে দমিয়ে রাখার মাধ্যমে

সমাজে নারীর প্রতি আচরণ নিয়ে যে দ্বিমুখী মানসিকতা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে, তার এক সংক্ষিপ্ত ও তীক্ষ্ণ প্রতীক এই বাক্যটি—“নারীর সামনে পুরুষালি ধমক, নারীর পেছনে নারীর কুৎসা।” এটি শুধু কথার খোঁচা নয়; এটি আমাদের সামাজিক রীতিনীতির গভীরতম অসুখের উপসর্গ।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে পুরুষত্বের একটি মুখোশ তৈরি হয়েছে—যেখানে শক্তির প্রকাশ হয় ধমক, উচ্চস্বরে কথা বলা, কিংবা নারীর আত্মবিশ্বাসকে দমিয়ে রাখার মাধ্যমে। সামাজিক প্রশিক্ষণ পুরুষকে শেখায় যে কর্তৃত্ব মানেই ক্ষমতা, আর নারীকে নিয়ন্ত্রণ করাই পুরুষত্বের প্রমাণ। এই বিভ্রান্ত ধারণা পরিবার, স্কুল, কর্মক্ষেত্র—সব জায়গায় অনুমোদন পায়।

অন্যদিকে নারীর পেছনে নারীর বিরুদ্ধে কুৎসা রটানোর প্রবণতাও একই কাঠামোর ফসল। সংকীর্ণ সুযোগ, নিরাপত্তাহীনতা এবং দীর্ঘদিনের অবমূল্যায়ন নারীর মধ্যে প্রতিযোগিতা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস জন্ম দেয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এই বিভাজনটিকেই বারবার কাজে লাগায়—কারণ নারীরা যখন একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন তাদের সামগ্রিক অবস্থান দুর্বলই থাকে।

এই দুই ধরনের আচরণ—ধমক ও কুৎসা—আসলে একই অসাম্যব্যবস্থার দুই দিক। আমরা যে সমাজে বাস করি, সেখানে নারীকে সম্মান, নিরাপত্তা ও সমতা এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে গণমাধ্যম, কর্মক্ষেত্র থেকে পরিবার—সবখানেই নারীর স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিয়ে রয়েছে প্রশ্নচিহ্ন। ফলে আচরণের এই অস্বাস্থ্যকর দ্বিমুখিতা বাড়তেই থাকে।

এখন প্রয়োজন স্পষ্ট অবস্থান নেয়ার। সমাজকে বুঝে নিতে হবে যে, সমতা কোনো ‘দয়া’ নয়, এটি একটি ন্যায্য অধিকার। পুরুষত্বের ভুল ধারণা ভেঙে শক্তির নতুন সংজ্ঞা তৈরি করতে হবে—যেখানে সম্মান, সংলাপ ও সহযোগিতা থাকবে প্রথমে। নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি ও সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন নারীর প্রতি নেতিবাচক সামাজিক ভাষা ও কুৎসার সংস্কৃতি ভাঙা।

এখনও সময় আছে। দ্বিমুখী আচরণের মুখোশ খুলে সত্যিকারের মানবিক সমাজের পথে হাঁটতে হলে নারী-পুরুষ উভয়ের দায়িত্বই সমান। কারণ একটি সমাজের সভ্যতা প্রকাশ পায় সে সমাজ নারীর সাথে কেমন আচরণ করে—ধমকে নয়, সম্মানে; কুৎসায় নয়, সমতায়।

Shamiur Rahman

Related