ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত হচ্ছে; সময় চায় এক্সিম ব্যাংক
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ব্যাংক দুটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে এই তথ্য জানানো হয়
শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক খাতের সংকট নিরসনে একীভূতকরণে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ এগিয়ে যাচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত হওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে এক্সিম ব্যাংক আপাতত একীভূত প্রক্রিয়ায় যুক্ত না হয়ে পুনরুদ্ধারের জন্য আরও সময় চেয়েছে।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ব্যাংক দুটির পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে এসব তথ্য জানানো হয়।
বৈঠকে এক্সিম ব্যাংক তাদের পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা উপস্থাপন করে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও বিস্তারিত পরিকল্পনা জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এক্সিম ব্যাংক জানিয়েছে, আগামী বৈঠকে সংশোধিত পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হবে।
এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম স্বপন বলেন, পাঁচটা ব্যাংক একীভূত করতে গিয়ে তিনি এক্সিম ব্যাংককে কেন এখানে ঢুকাচ্ছেন, এটা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।
বৈঠক থেকে বেরিয়ে স্বপন সাংবাদিকদের বলেন, "আমরা পুনরুদ্ধারের একটি রোডম্যাপ দিয়েছি। বাংলাদেশ ব্যাংক আরও নির্দিষ্টভাবে তা সংশোধনের পরামর্শ দিয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে আমরা তা উপস্থাপন করব।"
এক্সিম ব্যাংকের খেলাপি ঋণ যেখানে ২৮ শতাংশ, সেখানে এর দ্বিগুণের বেশি ৫৮ শতাংশ সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের। আর শতভাগ খেলাপি ঋণের দিকে হাঁটা ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের রয়েছে ৯৩ শতাংশ, গ্লোবাল ব্যাংকের ৯৪ ও ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৬ শতাংশ।
এমন চিত্র তুলে ধরে কোনোভাবেই একীভূত হতে চায় না এক্সিম ব্যাংক। এক্সিম ব্যাংক চেয়ারম্যান বলেন, বাকি চারটি ব্যাংকের মোট ব্যবসা এক্সিম ব্যাংকের থেকে কম। সেটি বিশাল অঙ্কের টাকা। তাই এসব ব্যাংকের সঙ্গে এক্সিম ব্যাংককে কোন মানদণ্ডে একীভূত করা হচ্ছে এটি বোধগম্য নয়।
তিনি আরও বলেন, কোন নিয়মে বা কোন পদ্ধতিতে একীভূত করা হবে; সেটি জানালে আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখতে পারতাম। সেখানে আমাদের কোনো ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলে সংশোধন করতাম, না পারলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তই সরাসরি মেনে নিতাম।
এদিকে, একীভূত ব্যাংকের গ্রাহকদের লেনদেনে যেমন কোনো সমস্যা হবে না, তেমনি কর্মীরা চাকরি হারাবে না বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
এর আগে গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে ব্রিজ ব্যাংক গঠনের পক্ষে নিজেদের সমর্থন জানায় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক।
বৈঠক শেষে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার সঙ্গে তাদের দ্বিমত নেই। আমানতকারীদের সুরক্ষার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক দেখবে।
তিনি জানান, ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক থেকে এস আলম বেনামে ৩৮ হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। ব্যাংক থেকে নিজের নামে অর্থ নেওয়ার সুযোগ না থাকায় বেনামি ঋণ নেওয়া হয়েছে। বেনামি ঋণের টাকা আদায় না হওয়ায় ব্যাংকটি এত বিপর্যয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে ইউনিয়ন ব্যাংকের চেয়ারম্যান মো. ফরিদউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, গ্রাহকরা টাকা তুলতে আসছেন, কিন্তু আমরা দিতে পারছি না। যত দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, ততই ভালো। একীভূত করা হোক, পুনর্গঠন করা হোক কিংবা অন্য যে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হোক না কেন সেটি দ্রুত হওয়া দরকার।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, এস আলম গ্রুপ ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে ২৮ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে এবং সেই ঋণগ্রহীতাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এই কারণে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যাংকটি হিমশিম খাচ্ছে।
কোনো ব্যাংকের একা চলার মতো সামর্থ্য থাকলে তাকে যেমন একা চলতে দেয়া উচিত; তেমনি ব্যাংকিং রেজ্যুলেশন অর্ডিন্যান্স মেনে একীভূত করা হচ্ছে কি-না তা খতিয়ে দেখার পরামর্শ অর্থনীতিবিদের।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে, সেটি অবশ্যই জানাতে হবে। ব্যাংকিং রেজ্যুলেশন অর্ডিন্যান্সের ধারা অনুযায়ীই কাজ করতে হবে। আইনগতভাবে সেই সুযোগটি কি বা রেজ্যুলেশন প্ল্যানটি অবশ্যই ব্যাংকে আগে জানাতে হবে।
এদিকে, একীভূত ব্যাংকের গ্রাহকদের লেনদেনে যেমন কোনো সমস্যা হবে না, তেমনি কর্মীরা চাকরি হারাবে না বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বৈঠকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর, চারজন ডেপুটি গভর্নর এবং ব্যাংক রেজ্যুলেশন বিভাগের কর্মকর্তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই সপ্তাহজুড়ে একীভূতকরণ নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
আজ সকালে গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং বিকালে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
Shamiur Rahman
