উপদ্রব বৃদ্ধি ৪০ শতাংশ চলছে ওষুধের কার্যকারিতা যাচাই

মশার কামড়ে অতিষ্ঠ ঢাকাবাসী

Published: 26 February 2026 02:02

আগামী মার্চ মাসে মশার এই প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে উত্তরার কিছু এলাকা, নন্দীপাড়া, শেখেরটেক, বাসাবো, রামপুরা, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ এবং শনির আখড়ায় লার্ভার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে

রাজধানী ঢাকায় মশার উপদ্রব এখন ভয়াবহ এক রূপ ধারণ করেছে। মশার কামড়ে অতিষ্ঠ নগরবাসীর ঘরে কয়েল কিংবা অ্যারোসল ছিটিয়েও মিলছে না স্বস্তি।শহর, নগর, বন্দরে দিনে-রাতে মানুষকে কামড়াচ্ছে মশা।

এদিকে, কিউলেক্স মশার বাড়বাড়ন্তের মধ্যেই নীরবে প্রাণ কাড়ছে ডেঙ্গু। মশক নিধনে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় খাল-বিল-ডোবায় বংশবিস্তার করছে কিউলেক্স।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, গত জানুয়ারির তুলনায় চলতি ফেব্রুয়ারিতে মশার ঘনত্ব বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি। বর্তমানে মশার প্রজনন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোনো কোনো এলাকায় ঘণ্টায় গড়ে ৮৫০টি পর্যন্ত মশা কামড়াতে আসছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশারের নেতৃত্বে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে ঢাকার মশার ৯০ শতাংশই হচ্ছে কিউলেক্স।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, আগামী মার্চ মাসে মশার এই প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে উত্তরার কিছু এলাকা, নন্দীপাড়া, শেখেরটেক, বাসাবো, রামপুরা, কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ এবং শনির আখড়ায় লার্ভার ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে।

গবেষক ও কীটতত্ত্ববিদরা ঢাকায় মশার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির পেছনে তিনটি প্রধান কারণকে দায়ী করছেন। প্রথমত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই বছর শীতের স্থায়িত্ব কম ছিল এবং গরম আগেভাগেই শুরু হয়েছে; যার ফলে তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে মশার জীবনচক্র দ্রুত সম্পন্ন হচ্ছে এবং স্ত্রী মশার রক্তপানের চাহিদা বেড়ে গেছে।

দ্বিতীয়ত, ঢাকার নর্দমা ও বদ্ধ জলাশয়গুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করার ফলে সেগুলো কিউলেক্স মশার নিরাপদ প্রজননস্থলে পরিণত হয়েছে।

তৃতীয়ত, বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সিটি কর্পোরেশন গুলোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় মশকনিধন কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা কাজ করছে। এছাড়া অনেক জলাশয়ে মাছ চাষের কারণে আইনি বা কারিগরি জটিলতায় সিটি কর্পোরেশন পর্যাপ্ত ওষুধ ছিটাতে পারছে না, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

এদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী বলেন, “জলাশয় ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জটিল। একবার পরিষ্কার করলেও তা দ্রুত আবর্জনায় ভরে যায়। ডিএনসিসি এলাকায় প্রায় আট হাজার বিঘা জলাশয় রয়েছে, যার বড় অংশই মশার প্রজননস্থল।

মশার এমন সীমাহীন অত্যাচারে প্রশ্ন উঠছে ওষুধের কার্যকারিতা নিয়ে। তাই ওষুধের কার্যকারিতা পরীক্ষা করতে গতকাল সরেজমিন মাঠে নেমেছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল এবং প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কিউলেক্স মশা ভয়াবহভাবে বেড়েছে এটা সত্য। এনিয়ে আমরা কাজ শুরু করেছি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই আমরা কীভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে পারি, সেই ব্যাপারে তৎপর হয়েছি। এখানে এসেছি ওষুধের গুণগত মান দেখার জন্য। পুরোদমে ওষুধ ছিটানো শুরু হবে। মশা ও লার্ভা নিধন করার ওষুধের স্যাম্পল নিয়েছি পরীক্ষা করার জন্য। ’

গতকাল রাজধানীর সায়েদাবাদে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম পরিদর্শন শেষে তিনি এই কথা বলেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আবদুুস সালাম।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘খালগুলোতে স্প্রে করার জন্য স্পিডবোটের ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়েছি। জলে-স্থলে মশা নিধনে ব্যাপক পরিসরে কাজ শুরু করব। জনগণের কাছ থেকে সহযোগিতা প্রয়োজন। টবের পানি, পরিত্যক্ত টায়ার এগুলো এডিস মশার জন্মস্থান। বাসাবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ’

এছাড়া মিরপুর-২-এ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মশক নিধন ওষুধ সংরক্ষণাগার পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত এবং ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান।

এদিকে, মশক নিধনে সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন নগরের বাসিন্দারা। এই বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার বলেন, ‘মশার প্রকোপ এখন প্রতিদিনই বাড়বে। বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত বাড়তেই থাকবে। তাই এমন পরিস্থিতিতে কিউলেক্স মশার বংশবিস্তার কমাতে ড্রেন, ডোবা, নালা, খাল পরিষ্কার করে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এডিস ও কিউলেক্স মশার নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আলাদা। তাই দুই ধরনের মশাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সমন্বিত বিজ্ঞানভিত্তিক মশক ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে। ঢাকার প্রায় ৮০ শতাংশ এডিস মশার জন্ম হয় তিন জায়গায়। নির্মাণাধীন ভবনের পানি জমে থাকা মেঝেতে ৪৭, বাড়ির নিচতলায় ১৭ এবং প্লাস্টিকের ড্রামে ১৫ শতাংশ এডিসের লার্ভা পাওয়া যায়। এই জায়গাগুলো নির্দিষ্ট করে মশার ওষুধ ছিটাতে হবে। এটাকে বলা হয় টার্গেট স্পেসিফিক মসকুইটো কন্ট্রোল। পরিকল্পনা করে কাজ কলে মশা নিয়ন্ত্রণে আসবে। ’

Shamiur Rahman

Related