প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতুতে টোল বন্ধের দাবি
পোস্তগোলায় শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, গুলিতে নিহত ১
ঢাকার পোস্তগোলায় প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতু (বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু-১) টোলমুক্ত ঘোষণার দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন।
ঢাকার পোস্তগোলায় প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতু (বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু-১) টোলমুক্ত ঘোষণার দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে এক শ্রমিক নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরো অর্ধশতাধিক। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ নয় শ্রমিককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গতকাল সকাল ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে।
সংঘর্ষ চলাকালে গুলিতে নিহত শ্রমিকের নাম সোহেল। তিনি ট্রাকচালকের সহকারী (হেলপার) হিসেবে কাজ করতেন। গুলিবিদ্ধ অন্যদের মধ্যে আটজনের নাম জানা গেছে। তারা হলেন— আলামিন, সিদ্দিক, সবুজ, লিটন, বিল্লাল, মানিক, আকাশ ও মাসুদ।
শ্রমিক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশের ছোড়া গুলিতেই এসব হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, তারা ফাঁকা গুলি ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়েছেন। পুলিশের গুলিতে কেউ মারা যায়নি।
পুলিশ, পরিবহন শ্রমিক ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতুটি টোলমুক্ত করার জন্য দীর্ঘদিন ধরেই দাবি জানিয়ে আসছিলেন পরিবহন শ্রমিকরা। সম্প্রতি সেতুতে টোলের হার বৃদ্ধি করা হলে গত মঙ্গলবার সেতু অবরোধ করে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ করে দেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা। সে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গতকাল সকাল ৭টা থেকে সেতু অবরোধ করে রাখেন পরিবহন শ্রমিকরা। দুই পাশে ট্রাক দিয়ে বন্ধ করে দেন যান চলাচল।
সকাল ৯টার দিকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে এসে ট্রাকগুলো সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। এ সময় ইট-পাটকেল ছুড়ে পুলিশকে বাধা দেন আন্দোলনরত শ্রমিকরা। পাল্টা হিসেবে পুলিশও আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে ফাঁকা গুলি ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশের গাড়ি ভাংচুর করেন। দুপুর ১২টার দিকে পরিস্থিতি শান্ত হলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
আন্দোলনরত শ্রমিকরা জানিয়েছেন, ঢাকায় প্রবেশের সময় অন্য কোনো সেতুতে টোল আদায় না হলেও দীর্ঘ ২৯ বছর ধরে বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতুতে টোল আদায় করে আসছে সরকার। এমনকি ২০০১ সালে চালু হওয়া দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতুতে প্রায় পাঁচ বছর আগে টোল আদায় বন্ধ করা হয়েছে। এমন অবস্থায় আমরা দীর্ঘদিন ধরে প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতুতে টোল আদায় বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। আমাদের দাবি না মেনে উল্টো গত মাসে এ সেতুতে টোলের হার অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে।
শ্রমিকরা বলেন, এ সেতুতে আগে একটি ট্রাক পার হতে ৩৫ টাকা টোল দিতে হতো। সম্প্রতি তা ২৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সিএনজি অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও রিকশা-ভ্যান পারাপারে আগে কোনো টোল না থাকলেও বর্তমানে সিএনজি অটোরিকশাপ্রতি ৫০, মোটরসাইকেলপ্রতি ৩০ ও রিকশা-ভ্যান পারাপারে ২০ টাকা করে টোল আদায় করা হচ্ছে। টোল আদায় বন্ধের দাবি জানিয়েও উল্টো আমাদের বাড়তি টোল দিতে হচ্ছে। ফলে আমরা বাধ্য হয়েছি আন্দোলনে নামতে। আমাদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। লাঠিচার্জ করেছে। পুলিশের গুলিতে একজন নিহতসহ অন্তত ৫০ জন শ্রমিক আহত হয়েছেন।
সংঘর্ষ চলাকালে একজন নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও তা পুলিশের গুলিতে হয়নি বলে দাবি করেছেন দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহজামান। তিনি বলেন, সকাল থেকেই শ্রমিকরা সেতু অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ফলে দুই পাশে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে পুলিশ শ্রমিকদের সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে তারা পুলিশের ওপর হামলা চালান। এ সময় পুলিশের কয়েকটি গাড়ি ভাংচুর করে আগুন দেয়ারও চেষ্টা করেন তারা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়েছে। শ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন ওসি শাহজামান।
একই ধরনের কথা বলেছেন ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুম আহমেদ ভূঁইয়া। তিনি বলেন, শ্রমিকদের সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করতেই পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুড়েছে। পুলিশের গুলিতে কেউ নিহত হননি। তার পরও ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে।
প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতুতে টোল আদায়ের দায়িত্বে রয়েছে আলম এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. আলম দাবি করেছেন, টোল বাড়ানো হয়েছে সরকারি সিদ্ধান্তে। তারা বড় অংকের টাকা ব্যয় করেই সেতুতে টোল আদায়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। ফলে টোল আদায় বন্ধের প্রশ্নই ওঠে না।
এর আগে ২০১৫ সালে টোল বন্ধ করার দাবিতে প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতু টানা তিনদিন অবরোধ করে রেখেছিলেন শ্রমিকরা। ওই সময় নৌ-পরিবহনমন্ত্রী ও পরিবহন নেতা শাজাহান খানের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
Akhi Malek
