ব্রিটিশরা যেভাবে একটি দ্বীপপুঞ্জকে জনশূন্য করেছিল
ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তে ১৯৬০ এর দশকের শেষের দিকে এই দ্বীপের পুরো দেড় হাজার অধিবাসীকেই উচ্ছেদ করা হয়। উদ্দেশ্য, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দ্বীপটি বিক্রি করে দেওয়া!
দিয়াগো গার্সিয়া- ভারত মহাসাগরের মাঝখানে অবস্থিত চাগোস দ্বীপপুঞ্জের (archipelago) একটি ছোট্ট দ্বীপ। এটা শুধু একটি দ্বীপ নয়; একটি অঞ্চলকে পুরো জনশুন্য করে দিয়ে সেই ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার করুণ ইতিহাস।
এই ইতিহাস পৃথিবীর নানা প্রান্তে ব্রিটিশ অপকর্মের একটা উদাহরণ। একটি সরকার ব্যবস্থা কীভাবে তাদের অবৈধ কাজকে মিথ্যা দিয়ে সত্যায়ন করতে পারে দিয়াগো গার্সিয়া দ্বীপ তার একটি প্রমাণ।
হ্যারল্ড উইলসনের নেতৃত্বে ব্রিটিশ সরকারের সিদ্ধান্তে ১৯৬০ এর দশকের শেষের দিকে এই দ্বীপের পুরো দেড় হাজার অধিবাসীকেই উচ্ছেদ করা হয়। উদ্দেশ্য, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দ্বীপটি বিক্রি করে দেওয়া!
নির্মম অত্যাচার করে দ্বীপের বাসিন্দাদের জাহাজে করে সিসিলিস দ্বীপপুঞ্জে ফেলে আসা হয়। স্বয়ংসম্পন্ন, স্বচ্ছল সেই দ্বীপের বাসিন্দাদের কেউ কেউ না খেয়ে-অত্যাচারে মারা যায়, কেউ বা আত্নহত্যা করে। অন্যদিকে মেয়েদেরকে বাধ্য করা হয় পতিতাবৃত্তিতে!

এখন সেই দ্বীপটিই যুক্তরাষ্ট্রের গড়ে তোলা সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটিগুলোর একটি অবস্থিত। সেখানে দুই হাজারের বেশি সেনা, যুদ্ধবিমানের দুটি রানওয়ে, ৩০টি যুদ্ধ জাহাজ, পারমাণু অস্ত্রবাহী সাবমেরিন ও গোয়েন্দা তৎপরতার জন্য স্যাটেলাইট স্টেশন রয়েছে। নাইন-ইলেভেনের পর আফগানিস্তান থেকে তথাকথিত জঙ্গিদের ধরে এখানে এনে নির্যাতন করা হতো। এ ছাড়া ইরাক ও আফগানিস্তানে আক্রমণের জন্যেও এই ঘাঁটি ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে দ্বীপটিতে মার্কিন ও বৃটিশ সৈন্য এবং তাদের সহযোগী অংশীদার ছাড়া আর কেউ নেই।
অন্যদিকে, এই দ্বীপের অধিবাসী যাদের যাদের জোর করে বিতাড়িত করা হয়েছিল, তারা পিতৃভূমির অধিকার ফিরে পাবার জন্য লন্ডনের আদালতে ধরণা দিচ্ছে। কিন্তু আফসোস, সেই আদালতও প্রমাণ থাকার পরও একের পর এক উল্টো রায় দিয়েছে। বিগত হাজারো বছরের শত শত সভ্যতার অসভ্য-নির্মমতাগুলো আমরা যেভাবে ইতিহাসে পড়ি, ভবিষ্যতেও দিয়াগো গার্সিয়ার ইতিহাসও এভাবে পঠিত হবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, রাশিয়ার সাথে স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে তাদের সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করার ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী হয়ে উঠেছিল। এই সময়ে তাদের চোখ পড়ে ভারত মহাসাগরের ব্রিটিশ উপনিবেশ চাগোস দ্বীপপুঞ্জের (Chagos Archipelago) সবচেয়ে বড় দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়ার দিকে।
এই দ্বীপের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ব্রিটিশদের পারমাণবিক সাবমেরিন প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রস্তাব করেছিল- যা ছিল অত্যন্ত গোপনীয়। এই বিনিময় থেকে শুরু করে দ্বীপের বাসিন্দাদের উচ্ছেদ প্রক্রিয়া, সবকিছুই হয়েছিল অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে।
-2024-06-25-09-50-37.jpeg)
উচ্ছেদের আরও ২০ বছর পরে যখন দ্বীপবাসীরা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য সর্বাত্মক আইনি লড়াই শুরু করে, কেবল তখনই প্রকাশ পায় ব্রিটিশ সরকার সরাসরি এই চক্রান্তের সাথে যুক্ত ছিল।
লন্ডনের পাবলিক রেকর্ড অফিসের নথিপত্র ঘাটতে গিয়ে দ্বীপবাসীর পক্ষে লড়াই করা আইনজীবীদের মাধ্যমে বেরিয়ে আসে চাগোস দ্বীপপুঞ্জের উচ্ছেদ বিষয়ক গোপনীয় নথিপত্র, উন্মোচিত হয় দীর্ঘদিন আড়াল করে রাখা নির্মম সত্য।
গোপনীয় নথিপত্রে দেখা যায়, চাগোস দ্বীপপুঞ্জ স্থানীয় বাসিন্দাশূন্য করতে সময় লেগেছিল প্রায় ১০ বছর। হতভাগ্য এই বাসিন্দাদের মধ্যে প্রায় ২৬টি পরিবার মৃত্যুবরণ করেন নিষ্ঠুর দরিদ্রতায়, ৯ জন আত্মহত্যা করেছিল এবং বেঁচে থাকার তাগিদে মেয়েরা বাধ্য হয়েছিল পতিতাবৃত্তিতে।
অবশ্য সে সময় বিনা কারণে নির্বাসিত এই বাসিন্দাদের প্রত্যেককে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়া হয় মাত্র ৩,০০০ ব্রিটিশ পাউন্ড বা তারও কম অর্থ! ঘরবাড়ি, গৃহপালিত পশু ও সর্বোপরি সবকিছু ফেলে আসার পর নতুন দারিদ্র্যের মুখে মানবেতর জীবনযাপন করা মানুষের জন্য এই অর্থ সহায়তা ছিল তাদের জীবনের প্রতি একধরনের উপহাস।
একটি নথিতে দেখা যায়, ব্রিটিশ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ঠিক কীভাবে এই অপকর্ম ঢাকতে হবে তার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে, যা মূলত নোংরা মিথ্যা ও গল্পে ভরপুর। কর্মকর্তাদের উল্লেখ করতে বলা হয় যে, নির্বাসিত এই মানুষগুলো স্থানীয় বাসিন্দা নয়, তারা ছিল অভিবাসী শ্রমিক।
অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিক জন পিলজার চাগোসিয়ানদের অনেকের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন এবং তাদের বর্ণনায় উঠে আসে ব্রিটিশ বর্বরতার নির্মম ঘটনা। এক মহিলা জানান, পরিবার নিয়ে চিকিৎসার জন্য মরিশাসের হাসপাতালে গেলে তাদের জানানো হয়, নিজেদের ভূমিতে আর কোনোদিন তাদের ফিরতে দেওয়া হবে না। এই সংবাদ শুনেই তার স্বামী স্ট্রোক করেন এবং মারা যান।
লিজেতে তালাত নামের আরেকজন জানান, তার বাচ্চারা একরকম ‘বিষণ্ণতায় মারা গেছে’। আকস্মিক এই উচ্ছেদ অভিযানের শুরুটা বেশিরভাগ পরিবারের জন্যই ছিল মারাত্মক আঘাত। চাগোসিয়ানদের জন্য মাতৃভূমি ছেড়ে ভিনদেশে যাওয়ার ধাক্কার সাথে যোগ হয়েছিল যাত্রাপথের দুঃস্বপ্ন, এরপর ছিল মৌলিক নাগরিক সুবিধাহীন নতুন আবাসভূমি এবং সবমিলিয়ে তৈরি হওয়া দরিদ্রতা।

তবুও বিতাড়িত চাগোস অধিবাসীরা হাল ছাড়েননি; অধিকার আদায়ের জন্য তারা এখন চালিয়ে যাচ্ছে আইনি লড়াই। এই লড়াইয়ে মরিশাসের সরকারও যুক্ত আছে। কিন্তু, ব্রিটিশ সরকারের নির্লজ্জ মিথ্যাচারের কাছে তাদের অধিকার আদায়ের লড়াই বিপর্যস্ত। ২০০০ সালে লন্ডনে হাইকোর্ট রায় দেয়, এই উচ্ছেদ ছিল সম্পূর্ণ অবৈধ।
আদালতের রায় ও ব্রিটিশ সংসদকে পাশ কাটানোর জন্য তখন টনি ব্লেয়ার ব্যবহার করেন রানির বিশেষ ক্ষমতা! কোনোভাবেই যেন চাগোস অধিবাসীরা তাদের দ্বীপে ফিরতে না পারে সেই চেষ্টা করে যাচ্ছিল সরকার, রাজকীয় সমর্থনও পেয়ে যাচ্ছিল তারা। চাগোস অধিবাসীদের তাদের ভূমিতে ফিরে যেতে দিতে হবে, হাইকোর্ট চূড়ান্ত এই রায় দিলে ২০০৮ সালে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর। আর দেশটির সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরাও নির্লজ্জভাবে আপিলের পক্ষে রায় দেয়। যদিও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা আদালতে নতুন কোনো তথ্য ও প্রমাণ কিছুই হাজির করেতে পারেনি।
পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ফ্রেব্রুয়ারি মাসে জাতিসংঘের ইন্টারন্যশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) রায় প্রদান করে, ব্রিটেনকে অবশ্যই দিয়েগো গার্সিয়াসহ চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। আদালতের রুলে বলা হয় ১৯৬৫ সালে এই দ্বীপপুঞ্জকে মরিশাস থেকে আলাদা করা ছিল বেআইনি। তবে আদালতের এই রুল মানতে আইনগত কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে এ রায় ব্রিটেনের পক্ষে যায় বলে মনে করা হয়।
পরে একই বছর মে মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাসিস্টসের রুলের পক্ষে এক প্রস্তাব পাস করা হয়। প্রস্তাবে চাগোস দ্বীপপুঞ্জ থেকে ব্রিটেনের কর্তৃত্ব অবসানের দাবি জানানো হয়। একই সাথে ব্রিটেনকে মরিশাসের অধিবাসীদের পুনর্বাসনে সহায়তারও আহবান জানানো হয়।
তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে লিখিত বিবৃতিতে বলা হয় যুক্তরাষ্ট্র বা বৃটেন কারো পক্ষ থেকেই সেখানে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার বন্ধের কোনো পরিকল্পনা নেই। ২০১৬ সালে উভয় সরকার এই ঘাটির কৌশলগত গুরুত্ব বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করে। ২০৩৬ সালের আগে দ্বীপ লিজের চুক্তি থেকে ফিরে আসারও কোনো ইচ্ছা তাদের নেই।
আন্তর্জাতিক আদালতের রায় মানতে ব্রিটিশ সরকার বাধ্য না হলেও জাতিসংঘের এই প্রস্তাবে ব্রিটেনের নৈতিক পরাজয় হয়েছে। তবুও ব্রিটিশরা এই দ্বীপের দখলদারি ছাড়বে বলে মনে হয় না।
তথ্যসূত্র- আল জাজিরা, ইন্টারনেট
Shamiur Rahman
