বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীদের টপকিয়ে হাইব্রিডরা সামনে
সংসদে জুলাই বিপ্লব ঘিরে টুকুর গর্জন
এই প্রথম সুলতান সালাউদ্দিন টুকু সংসদে বক্তব্য রাখলেন এবং প্রথম বক্তব্যেই বিএনপির আপামর নেতাকর্মী-সমর্থকদের চাঁপা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে জুলাই বিপ্লব নিয়ে কথা বললেন
গত ২৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে জুলাই বিপ্লব নিয়ে বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে কড়া প্রতিবাদ করেন টাঙ্গাইল সদর আসনের এমপি, প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। সাবেক ছাত্রনেতা টুকুর হুংকারে এসময় কেঁপে উঠে সংসদ গ্যালারি। টুকুর বক্তব্য সঙ্গে সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করার পর দেশে-বিদেশে আলোচনার ঝড় উঠে। বিএনপির নেতাকর্মীরা সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। সংসদে টুকুর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যটি ছিলো বেশ জোরালো প্রতিবাদ যা শুনে দেশবাসী তথা বিদেশে অবস্থানরত বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের মধ্যে কিছুটা হলেও তৃপ্তি ফিরে আসে। ছোট্ট বক্তব্যটি ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। বিরোধী দলের সাংসদগণ এবং তাদের নেতাকর্মীরাও অনেকটা অবাক হয়ে যান টূকুর এই হঠাৎ ক্ষেপে যাওয়ায়। কারণ, তারা জুলাই বিপ্লব নিজেদের ঘরে তোলার জন্য বেশ মরিয়া হয়ে উঠেছিল।
সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর এই প্রতিবাদেকে কেউ বলেছেন বাঘের গর্জন। আবার কেউ বলেছেন এতদিন পর হলেও বিএনপির কোন নেতা মুখ খুলে প্রতিবাদ করে বিরোধী দলকে দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে, বিএনপির হাইকমান্ড এই বিষয়ে এখনও চুপ রয়েছে।
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু সংসদে বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে বলেন, আওয়ামী লীগের পাতানো ৮, ১৪, ১৮ ও ২৪ সালের নির্বাচনের সরকার এটা নয়। এই সরকার জনগণের সরকার। আপনারা কাকে নিষ্ক্রিয় এবং নিশ্চিহ্ন করে দিতে চান? এই প্রথম সুলতান সালাউদ্দিন টুকু সংসদে বক্তব্য রাখলেন এবং প্রথম বক্তব্যেই বিএনপির আপামর নেতাকর্মী-সমর্থকদের চাঁপা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে জুলাই বিপ্লব নিয়ে কথা বললেন।
তিনি প্রথমেই স্পীকারকে বলেন, আপনি অনুমতি দিলে আমি তাদেরকে মুনাফিক বলতে চাই। মাননীয় স্পীকারের কাছে অনুমতি চান তিনি মুনাফিক শব্দটি উচ্চারণ করবেন কিনা । মাননীয় স্পীকার বলেন 'না' মুনাফিক বলতে পারেন না। তখন টুকু বলেন, ঠিক আছে, আপনি মুনাফিক বলতে না করেছেন আমি তাদেরকে মুনাফিক বললাম না।
এখানে প্রশ্ন হচ্ছে 'না' বলাতে কি বলা হয়নি 'মোনাফেক'? জনগণ কি বোঝেনি তিনি কোন দলের নেতাকর্মীকে মুনাফিক বলতে চেয়েছেন? তিনি কাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন? আসলেই জনগণের বুঝতে বাকি নেই যে টুকু আসলে কাদের ইঙ্গিত করে এই কথা বলেছেন।
মৎস্য ও প্রানীসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু সংসদে দেয়া প্রথম বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনীতি ও ৮৬/৯৬ সালে নির্বাচনের কথাও তুলেছেন। সেই নির্বাচনের বিষয়েও জামাতকে আঙ্গুল তুলে কথা বলেছেন টুকু। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকেও জামাত ইসলামী সরকার গঠন করতে সহায়তা করেছিলেন বলে বাংলার এই সুলতান তার বক্তব্যে স্পষ্ট করেন।
টুকু আরও বলেন, ৭৫ সালে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। ৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এরশাদের পতন ঘটে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে। তিনি লন্ডনে বসে টেলিবার্তায় সেদিন বিএনপির নেতাকর্মীদের আদেশ দিয়েছিলেন রাস্তায় নেমে আন্দোলন করার জন্য।
সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ২৬ এপ্রিল সংসদে হাঁসিমুখে বক্তব্য শুরু করলেও তার প্রতিটি কথায় যেন ঝরছিল আগুনের লেলিহান শিখা। তার প্রতিটি কথার বান এফোড়ওফোড় করে দিচ্ছিলো জামাত নেতাদের বুক। কিন্তু বিএনপির সংসদ সদস্যদের যেভাবে টেবিল চাপড়িয়ে টুকুকে বাহবা দেয়ার কথা ছিলো তা কিন্তু কেউই দেননি। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান খেয়াল করেছেন অবশ্যই। টুকুর দিকে তার নীরব চাহনি অন্তত সেই কথাই বলে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদ অধিবেশনে এতদিন হাসনাত আব্দুল্লাহসহ বিরোধী দলীয় নেতাদের বাঘের রূপ দেখলেও বাংলাদেশ ঐদিন নতুন বাঘকে দেখেছেন, তার গর্জন শুনেছেন।
এদিকে, এমন জ্বালাময়ী বক্তব্যের মধ্যেও টুকু কৌশলে টাঙ্গাইলের চরাঞ্চলসহ স্থানীয় জনগণের দাবি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে স্মরণ করে দিতে ভুলেনি। বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে সর্বশেষ বাক্যগুলো বলার সময় তিনি যেন অগ্নিরূপ ধারণ করেছিলেন। তিনি এসময় বলে উঠেন, হেরে যাবে রাজাকার, জিতে যাবে বাংলাদেশ। জুলাই বিপ্লব নিয়ে সংসদে বক্তব্য দিতে সম্ভবত তারেক রহমানও বোধহয় এমন একজন বাঘা সুলতানকেই খুঁজছিলেন।
উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনী প্রচার প্রচারণায় অংশগ্রহণ করতে গিয়ে, সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেছিলেন, জামাতকে রাজনীতি করতে দিলে জামাত রাজনীতি করতে পারবে। এদিন আবার নতুন করে তিনি বার্তা দিলেন জামাতকে। সুলতান বাংলার মা বোনদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তারা বেহেস্তের টিকিটকে প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে ভোট প্রদান করেছেন।
এদিকে, "আমাদের সুলতান" নামে খ্যাত টুকুর এমন আগ্রাসী ও জ্বালাময়ী বক্তব্যকে কেন্দ্র করে টাঙ্গাইলের সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে, সমস্ত মানুষের অন্তরে উৎসব বইছে। যার আমেজ থামছেই না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে টাঙ্গাইলবাসীর একটাই শ্লোগান, একটাই দাবি; আমাদের যোগ্য নেতা সুলতান সালাউদ্দিন টুকুকে প্রতিমন্ত্রী থেকে "মন্ত্রী" করা হোক।
তবে, মূল্যায়নের প্রশ্নে অনেক জাতীয়তাবাদী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নিরব হয়ে যাচ্ছেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, সামনে জামাত ও পেছনে আওয়ামী লীগ তৎপর হলে বিএনপি কি চিড়েচ্যাপটা হয়ে যাবে? বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বেশ কিছু জনকল্যাণমুখী ও সংস্কারমূলক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু দলের অনেক বাঘা বাঘা নেতাকে সাইডলাইনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। এই মুহুর্তে বিএনপির সবচেয়ে ত্যাগী নেতাদের তালিকা তৈরি করে তাদেরকে মূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। ত্যাগীদের মূল্যায়ন না করলে ৯৬ ও ২০০৮ সালের মতো ভরাডুবি হবে। যারা এখন প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে আছেন, দু'চারজন বাদে অনেকেই প্রবাসী। ক্ষমতার লড়াইয়ে তারা এগিয়ে থাকলেও দলের দুর্দিনে ত্যাগীরাই ছিলেন একমাত্র শক্তিশালী হাতিয়ার।
রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের গড়া দল বিএনপিকে প্রোপাগান্ডার মাধ্যমে স্বাধীনতা বিরোধী তকমা দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। টানা সাড়ে ১৫ বছর ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলন করেছে বিএনপি। চুড়ান্ত পর্যায়ে গণঅভ্যুত্থানে পনের'শর বেশিভাগ শহীদ তাদের। দলটির হাজার হাজার আহত,অন্ধ,পঙ্গু নেতাকর্মীরা অভ্যুত্থানের দগদগে স্মৃতি বহন করছে। তারপরও দলটিকে জুলাই বিরোধী হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে জামাত। নিজেদের অর্জনকে সুরক্ষা দিতে পারেনা বিএনপি। নাকি জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়ে শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা উপভোগ করতে চায় দলটি।
Shamiur Rahman

Please share your comment: