সরস্বতী পূজা: ডাইসের ভিড়ে হারাচ্ছে শিল্পীর হাতের কারুকাজ
হাতের তৈরি প্রতিমার বিশেষত্ব এখানেই—প্রতিটি সরস্বতী একরকম নয়। একেকটি মুখ, একেকটি অনুভব। ডাইসের একরূপতার ভিড়ে আজ সেই অনন্যতাই হারিয়ে যেতে বসেছে, যা একসময় বাংলার প্রতিমাশিল্পের প্রধান পরিচয় ছিল
সরস্বতী পূজা: ডাইসের ভিড়ে হারাচ্ছে শিল্পীর হাতের কারুকাজ
সরস্বতী হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রধান দেবী। তিনি জ্ঞান, শিক্ষা, অধ্যয়ন, শিল্প, বাক্, কবিতা, সঙ্গীত, ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিশুদ্ধির দেবী হিসেবে পূজিত হন। লক্ষ্মী ও পার্বতীর সঙ্গে তিনি দেবী ত্রয়ী গঠন করেন। সরস্বতী কেবল হিন্দু ধর্মেই নয়, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মেও সমভাবে পূজিত সর্বভারতীয় দেবী।
রাজবাড়ীতে ছোট একটি প্লেটের ওপর বসানো সরস্বতী প্রতিমাটি বানাচ্ছেন রতন পাল। আকারে ছোট হলেও তার চোখে ফুটে উঠেছে অনুভবে বিশালতা। প্রথম দৃষ্টিতেই চোখে পড়ে মুখের শান্ত ও সৌম্য ভাব—যেখানে কোনো বাড়তি নাটক নেই, আছে গভীর স্থিরতা। কুমারটুলির প্রাচীন মাটির কাজের ধারায়, ধাপে ধাপে বহুদিনের অভিজ্ঞতার ছোঁয়ায় এই মুখশ্রী গড়া হয়েছে।
বীণার কাঠের টেক্সচার, আঙুলের বাঁক, নখের রঙ—সবকিছুই হাতে গড়া, কোনো ছাঁচ বা ডাইসের কাজ নয়। শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে যে স্বাভাবিক গতি, তা শিল্পীর অভ্যস্ত চোখ ও দক্ষ হাতের পরিচয় দেয়। হাঁসের ডানায় পালকের স্তরবিন্যাসের সূক্ষ্মতা আজকের বাজারে খুব কমই দেখা যায়।
এই প্রতিমাটি তৈরি করেছেন শিল্পী রতন পাল। তাঁর নিজস্ব কোনো স্টুডিও নেই। হরিজন পল্লির একটি ক্লাবঘরের সামনে, কীর্তনের জায়গায় বসেই তিনি সরস্বতী প্রতিমা তৈরি করছেন। অন্তরমোড়েনের বিনয় চাঁদ পাল ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমা তৈরিতে। যত প্রতিমা বানানো যায়, ততটাই আয়—এই বাস্তবতার মধ্যেই তাঁদের কাজ।
রতন পালের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, “আগে ডাইস ছিল না, সবকিছু হাতে তৈরি করতে হতো। এখন ডাইস এসে গেছে, এতে অল্প সময়ে বেশি প্রতিমা বানানো যায়। আমাদের মতো হাতের কাজের শিল্পীদের পক্ষে তাদের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া কঠিন। তাছাড়া এখন পূজার সংখ্যাও কমে গেছে, অনেক জায়গায় সবাই মিলে একসাথে পূজা হচ্ছে।”
পালপাড়ার আরেক শিল্পী জগৎবন্ধু পাল জানান, ডাইসের প্রতিমা আর হাতে তৈরি প্রতিমার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট। “মানুষের রুচির পরিবর্তন এসেছে। আগে সবাই শুভ্র সাদা বসনের সরস্বতী পছন্দ করত, এখন বিভিন্ন রঙের প্রতিমার চাহিদা বেড়েছে।”
তবে হাতের তৈরি প্রতিমার বিশেষত্ব এখানেই—প্রতিটি সরস্বতী একরকম নয়। একেকটি মুখ, একেকটি অনুভব। ডাইসের একরূপতার ভিড়ে আজ সেই অনন্যতাই হারিয়ে যেতে বসেছে, যা একসময় বাংলার প্রতিমাশিল্পের প্রধান পরিচয় ছিল।
Shamiur Rahman
