চকবাজার অগ্নিকাণ্ড: পুরনো ঢাকার সংস্কার করা কি সম্ভব হবে?
চকবাজারে ভয়াবহ আগুনে ব্যাপক হতাহতের ঘটনার পর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউক বলছে পুরনো ঢাকার সংস্কারে পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে, যার কার্যক্রম শুরু হবে শিগগিরই।
চকবাজারে ভয়াবহ আগুনে ব্যাপক হতাহতের ঘটনার পর রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা রাজউক বলছে পুরনো ঢাকার সংস্কারে পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে, যার কার্যক্রম শুরু হবে শিগগিরই।
পুরনো ঢাকার অধিবাসীদের অনেকেই মনে করেন তাদের এলাকায় সংস্কার দরকার যদিও তারা বলছেন, সংস্কার বলতে কী বোঝানো হচ্ছে সেটি তারা আগে জানতে চান।
চকবাজারের একটি মার্কেটের তরুণ ব্যবসায়ী মো: ফয়সাল আলম বলছেন, "আগে সকালের রোদ আমার ঘরে ঢুকতো। এখন লাইট না জ্বালালে মনে হয় গুহার মধ্যে আছি। আমার ছাদ থেকে বুড়িগঙ্গা সদরঘাট পর্যন্ত দেখা যেতো। এখন কিছুই দেখা যায়না। আমার বাসা নীচে পড়ে গেছে, সূর্য মাথার ওপর না আসলে রোদই পাইনা"।
আব্দুল হাসিব নামে আরেকজন বলেন, কিভাবে কালক্রমে তাদের সম্পত্তি ভাগ হয়েছে এবং সেই সাথে পুরনো ঢাকা ঘিঞ্জি এলাকায় পরিণত হয়েছে।
"আমরা বাসা লালবাগ জগন্নাথ সাহা রোডে। দুই তিন পুরুষ ধরে আমাদের এখানে বসবাস। দেখা গেছে আমার বাবার ৫ কাঠা সম্পত্তির ওপর একটি বাড়ি ছিলো। আমরা ছয় ভাই বোন। কালের বিবর্তনে সেগুলো টুকরো হয়ে এক কাঠার মতো ভাগ পাই। তার ওপরই আমি পরিবার নিয়ে বসবাস করছি"।
আর এ চিত্র শুধু লালবাগ বা চকবাজারের নয়। বরং শত শত বছরের পুরনো যেসব এলাকা যেমন তাঁতিবাজার, শাঁখারিবাজার, আরমানিটোলা, বংশাল, কোতোয়ালি, সূত্রাপুর, নবাবপুর, কাপ্তান বাজারসহ সব এলাকারই একই চিত্র।
একেবারে মূল সড়ক কিছুটা প্রশস্ত হলেও যে এগারটি ওয়ার্ড নিয়ে পুরনো ঢাকা গঠিত তার সবই যেনো প্রচলিত কথার মতো বাহান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি।
ঐতিহাসিক স্থাপনা ও পুরনো ঢাকার গড়ে ওঠা
আর এর মধ্যেই রয়েছে, শাঁখারী বাজার, বড় কাটরা, ছোটো কাটরা, আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, লালকুঠি, আর্মেনীয় গির্জা, ঢাকেশ্বরী মন্দির বা এ ধরণের পুরনো অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা যেগুলোর সাথে মিশে আছে ঢাকাবাসীর আবেগ অনুভূতি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্বের শিক্ষক ও পুরনো ঢাকা নিয়ে গবেষণা করেছেন ড: একেএম শাহনাওয়াজ বলছিলেন পুরনো ঢাকা গড়ে উঠেছিলো কিভাবে আর এখনকার দুর্বিষহ অবস্থাতেই বা আসলো কিভাবে।
"আমরা বলি মুঘল আমল থেকে অর্থাৎ ঢাকার বয়স চারশো বছর। কিন্তু আধুনিক নতুন গবেষণায় বের হচ্ছে যে ঢাকার বয়স আসলে হাজার বছর। এখন ঢাকায় যে ঘিঞ্জি পরিবেশ এটা কালক্রমে হয়েছে আরবান প্ল্যানের দুর্বলতার কারণে। কোথায় আবাসিক এলাকা কিংবা কোথায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তা ঠিক করা হয়নি"।
তিনি বলেন মুঘল আমলে কিছু পরিকল্পনা দেখা যায়। যেমন মাহুত টুলি করা হয়েছিলো ঘোড়ার মাহুতদের জন্য। কিন্তু পরে ব্রিটিশ আমলে সে পরিকল্পনা আর থাকেনি। আর পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে আর কোনো কাজ হয়নি।
তার মতে এসব কারণেই পুরনো ঢাকা জুড়ে বসতি ও দোকানপাট সব একসাথে গড়ে তুলেছে নানা জায়গা থেকে আসা নানা ধরনের মানুষেরা।
সংস্কারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ কোনগুলো
রাজউকের হিসেবে পুরনো ঢাকার মধ্যে এখন আছে সিটি কর্পোরেশনের বারটি ওয়ার্ড। যেখানে আছে ছোটো বড়ো ২৪ হাজারের মতো স্থাপনা।
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আখতার মাহমুদ বলছেন এই একই জায়গায় ঘরবাড়ি, ব্যবসা, কারখানা, গুদাম-এমন বহুমাত্রিক কার্যক্রমের সাথে সরু রাস্তা ঘাট পুরনো ঢাকাকে ঝুঁকির মুখে নিয়ে গেছে। এই কারখানা আর গুদামগুলোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুরনো ঢাকার সংস্কারের জন্য।
"নতুন যে ধরনের কারখানা ও গুদাম হয়েছে তার মধ্যে রাসায়নিক দ্রব্য ও বিস্ফোরক দ্রব্যও রয়েছে। বিপজ্জনক বস্তুও রয়েছে। প্রথম একটা নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত যে ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম এই এলাকায় থাকবেনা। গুদামগুলো সরে গেলে নতুনত্ব তৈরি হবে। তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে আবাসিক এলাকায় কোন কোন কাজে কি ধরণের ভূমি ব্যবহারের অনুমতি দেয়া হবে। আর কোনো কাজে অনুমতি দেয়া হবেনা। এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।"
মি. মাহমুদ বলছেন ইতোমধ্যেই রাজউক থেকে পুরনো ঢাকার পুন:উন্নয়ন বা রিডেভেলপমেন্টের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু জমির মালিকানা নিয়ে ঝামেলা থাকা আর রাজউকের বিশ্বাসযোগ্যতা কম থাকায় পুরনো ঢাকার সংস্কারের উদ্যোগটি নিয়ে এখনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেয়া যাচ্ছেনা।
বুয়েটের নগর পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ইশরাত ইসলাম বলছেন পুরনো ঢাকার জমির মালিকদের সরকার বা রাজউকের প্রতি আস্থা বা বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করাই হবে পুরনো ঢাকার সংস্কারের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
"বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন স্বার্থ আছে। একটি ছোটো প্লটের মালিক হয়তো ৩২ জন। প্লট নিয়ে যেমন জটিলতা তেমনি এলাকার মধ্যেও জটিলতা আছে। আবার বহুকাল ধরে তারা আছেন, ব্যবসা আছে। এখন সরকার যদি ইনসেনটিভ দিয়ে বা ইকোনমিক প্যাকেজ দিয়ে কোনো একটা শো-কেস প্রজেক্ট করা যায়। মানুষকে বোঝানো যে তাদের ক্ষতি হবেনা। এ বিষয়ে ভুল ধারণা তাদের আছে সেটি দুর করতে হবে।"
ইশরাত ইসলামের সাথে একমত বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ প্লানার্স এর জেনারেল সেক্রেটারি ড:আদিল মোহাম্মদ খান। তবে তিনি বলছেন পুরনো ঢাকা নিয়ে যে কোনো ধরনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে পুরনো ঢাকার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
"চাইলে পুরনো ঢাকাকে ব্লক ভিত্তিক ভাগ করে পুন:উন্নয়ন করে আধুনিক ঢাকা বানাতে পারি। কিন্তু আধুনিক ঢাকা বানানোই সমাধান না। কারণ এটি হলো পুরনো ঢাকার বৈশিষ্ট্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা নষ্ট হবে। কিন্তু একই সাথে পুরনো ঢাকার বাসযোগ্যতাও ফিরিয়ে আনা দরকার। এজন্যই সীমিত ভাবে ধাপে ধাপে পুনর্বিন্যাস করে যাতে করে বাসযোগ্যতা বাড়ে, খোলা জায়গা বাড়ে ও ঐতিহ্য, স্থাপনা ও সংস্কৃতিও রক্ষা হয়। আরবান রিনিউয়ালের নামে যেন এগুলো নষ্ট না করি।"
রাজউকের পাইলট প্রজেক্ট ও নতুন পরিকল্পনা
তবে রাজউক বলছেন দশ বছর আগে নিমতলীতে আগুনে ১২০ জনের মৃত্যুর পরই তারা পুরনো ঢাকা নিয়ে ভাবতে শুরু করে।
এর ধারাবাহিকতায় পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে বংশালে ৩০ বিঘা জমিকে নিয়ে একটি পরিকল্পনা করা হয়েছিলো। এ জমিতে জমি বা বাড়ির মালিক ছিলেন প্রায় দুশো জনেরও বেশি।
কিন্তু প্রভাবশালী একটি অংশের বিরোধিতায় বিশেষ করে যারা সরকারি খাস জমিতে বড় ভবন বানিয়েছেন তাদের এক অংশের কারণে সেটি আর বাস্তবায়িত হয়নি।
এখন চকবাজারের ভয়াবহ আগুনের ঘটনার পর নতুন করে উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে রাজউক। কি আছে তাদের পরিকল্পনায়?
জবাবে রাজউকের প্রকল্প পরিচালক মো: আশরাফুল ইসলাম বলেন, "একটা কমিউনিটি ব্লক যদি হয়। ২০/২৫ জন মিলে এক বিঘার একটি প্লট হলে সেখানে আমরা বহুতল ভবন তৈরি করলাম। এর গ্রাউন্ডের কিছু অংশ রাস্তার জন্য, কিছু অংশ আমরা আগুন প্রতিরোধ ও কিছুটা বাচ্চাদের খেলার জন্য ছেড়ে দিলাম।"
তিনি বলেন প্রয়োজন হলে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা সংশোধন করে ৮ তলার জায়গায় ১২ তলা করার অনুমতি দেয়া হবে। তাতে করে গ্রাউন্ডে কিছু জায়গা তৈরি হবে।
আর এটা হলে এই পুরনো ঢাকাই নতুন ঢাকার মতো বা আরও বেশি সুন্দর হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে পুরনো ঢাকার অধিবাসীরা কী বলছেন
একজন ব্যবসায়ী বলেন বলেন, "প্রথমেই জানাতে হবে কি ধরনের সংস্কার সরকার চায়। সেটি ভালো হলে আমরা সহযোগিতা করবো।"
নুসরাত জাহান নামে একজন বলেন তিনি মনে করেন সংস্কারের প্রয়োজন আছে। "হাঁটাচলার জায়গা নেই। গাছপালা নেই। লেনগুলো সরু। অল্প বৃষ্টিতে পানি ওঠে। সংস্কার ছাড়া এটা কিভাবে পরিবর্তন হবে।"
আরেকজন বলেন, "আমার বাড়ি আছে। এখন সরকার যদি বলে বাড়িটা সরিয়ে কিছু করবে। তাহলে আমাকে তো কোনো ব্যবস্থা করে দিতে হবে।"
তবে রাজউক বলছে চকবাজারের ঘটনার পর এখন পুরনো ঢাকার অধিবাসীদের অনেকেই সংস্কারের প্রতি ইতিবাচক আর সে কারণেই খুব শিগগিরই এলাকা ভিত্তিক আলোচনা শুরু হবে যাতে করে সংস্কার ইস্যুতে তাদের মধ্যে থাকা নেতিবাচক ধারণা দুর করে দ্রুত কাজ শুরু করা সম্ভব হয়।
Akhi Malek
