ব্যবসায়ীর ৩৫ কোটি টাকা লোপাট, উত্তরা পূর্ব থানায় মামলা দায়ের
প্রাচীন "পিলার ও কয়েন" প্রতারক চক্র সক্রিয়
প্রতারকদের লোভনীয় প্রস্তাবে থাকে রাতারাতি গাড়ি-বাড়ি, আমেরিকার লাল পাসপোর্ট, বিদেশি একাউন্টে মিলিয়ন বিলিয়ন টাকার লেনদেন। কোন কোন ক্ষেত্রে খদ্দেরদের আকৃষ্ট করতে জ্বীনের বাদশাকেও হাজির করে থাকে প্রতারকরা। অথচ বাস্তবে পুরোটাই মি
বাংলাদেশে প্রায় দুই যুগ ধরে প্রাচীন পিলার ও কয়েন কেনা-বেচার নামে চলছে ভয়াবহ প্রতারণা। খোদ রাজধানীতেই বিশাল এক সঙ্ঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। এদের বিরূদ্ধে প্রশাসন তেমন কোন আইনি শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় শত শত ব্যবসায়ী এই প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে পথের ভিখারি হয়েছে। এই চক্রের সদস্যরা দেশব্যাপী জাল বিস্তার করে অভিনব কায়দায় কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। তাদের প্রতারণার ফাঁদ এতটাই লোভনীয়, যা শুধু ফাঁদে পড়া ভুক্তভোগী ছাড়া আর কেউ অবগত না।
প্রতারকদের লোভনীয় প্রস্তাবে থাকে রাতারাতি গাড়ি-বাড়ি, আমেরিকার লাল পাসপোর্ট, বিদেশি একাউন্টে মিলিয়ন বিলিয়ন টাকার লেনদেন। কোন কোন ক্ষেত্রে খদ্দেরদের আকৃষ্ট করতে জ্বীনের বাদশাকেও হাজির করে থাকে প্রতারকরা। অথচ বাস্তবে পুরোটাই মিথ্যা ও ধোকাবাজি। প্রতারক চক্র খদ্দেরদের কাছে এমনভাবে "কয়েন" উপস্থাপন করে যা বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনকেও হার মানায়।
রাজধানীর বাড়িধারা (ডিওএইচএস), মিরপুর (ডিওএইচএস) ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় প্রতারকরা অফিস নিয়ে দেশব্যাপী তাদের সদস্য এবং এজেন্ট নিয়োগ করেছে। প্যারাডো গাড়ি এবং সুন্দরী নারীদের এই কাজে ব্যবহার করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে খবর জানা গেছে।
সম্প্রতি, প্রাচীন পিলার ও কয়েন ব্যবসার সাথে জড়িত চারজন প্রতারককে গত শুক্রবার গ্রেফতার করেছে উত্তরা পূর্ব থানা পুলিশ। প্রবাসী বাংলাদেশী আজিজুল আলমের দায়ের করা মামলায় ২৪ জন আসামির মধ্যে এই চক্রের চারজনকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানান উত্তরা পূর্ব থানার ওসি। বাকীদের গ্রেফতার করতে অভিযান চলছে। গ্রেফতারকৃতদেরকে পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। কিন্তু থানায় বসেই বাদীকে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।
থানা সূত্রে জানা গেছে, "আসামিরা বাদীকে থানায় দেখেই পুলিশের সামনে চিল্লিয়ে বলে, "আমরা বেশি দিন জেলে থাকবো না। বের হয়েই তোর খবর নিয়ে ছাড়বো। তুই আমাদের ব্যবসার ক্ষতি করে পার পাবিনা।"
থানার ভিতরেই আসামীদের এমন প্রচ্ছন্ন হুমকিতে মামলার বাদী আজিজুল আলম মামলা করেও দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন বলে জানান এই প্রতিবেদককে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টর মাহবুব রহমান জানান, প্রতারক চক্র ইউরেনিয়ামসমৃদ্ধ প্রাচীন পিলার এবং প্রাচীন কয়েনের ব্যবসার কথা বলে সুকৈশলে বাদীর নিকট হতে বিভিন্ন সময়ে ৩৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ঠিক একইভাবে তারা আরও অনেক মানুষকে নিঃস্ব করেছে। রিমান্ডে প্রতারক চক্র পুলিশের কাছে তাদের প্রতারণার কৌশলের বিবরণ দিয়েছে। আজিজুল আলম ছাড়াও আরো যাদের সাথে প্রতারণা করেছে, তাদের নামের তালিকাও স্বীকারোক্তিতে জানিয়েছে। যা শুনলে গা শিউরে উঠে।

সূত্রমতে, মানুষের সাথে মিথ্যা কথা বলে, সুন্দর আচরণ করে নির্মমভাবে টাকা হাতিয়ে নেয়াই হচ্ছে তাদের পেশা ও নেশা। প্রতারক চক্রের প্রত্যেক সদস্য আলিশান জীবন যাপন করে বলেও পুলিশের কাছে তারা স্বীকার করেছে। প্রতারণার টাকায় রাতে মদপান, নারীদের সাথে বেহায়াপনা, গান-বাজনা ও শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ভিডিও ইতোমধ্যে উদ্ধার করেছে পুলিশ।
এই প্রতিবেদকের হাতেও প্রতারকদের ভিডিওসহ অনেক তথ্য উপাত্ত পাওয়া গেছে। প্রতারকরা যাতে সহসাই জামিন না পায় সেজন্য প্রশাসনের কঠোর ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী আজিজুল আলম।
মামলার বিবরণ ও ভুক্তভোগী আজিজুল আলমের বক্তব্য হচ্ছে, কথিত জ্বীনের বাদশা রাসেল নিজের ফোন নম্বর থেকে আজিজুল আলমকে ফোন দিয়ে বলে, "বাবা তুই তো বড় ভাগ্যবান ব্যক্তি, তুই তো দুনিয়ার বাদশা আখিরাতেরও বাদশা হয়ে গেছিস"।
জ্বীনের বাদশা আরো বলে," তুই একটা মূল্যবান জিনিস প্রাচীন পিলার ম্যাগনেট পাবি, যার মূল্য ১০০ বিলিয়ন ডলার"। তবে এই কথা কাউকে বলবে না, বললে আর পাবে না। জ্বীন আজমীর শরীফ থেকে কথা বলছেন বলে জানায় আজিজুল আলমকে। এই ঘটনা গত বছরের অক্টোবর মাসের।
আজিজুল আলম এই প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে জানান, জ্বীন রাসেল আমাকে দামী গাড়ী, বাড়ী, নারী এবং আমেরিকা যাওয়ার প্রলোভন দেখায়। কিছুদিন পর আবার জ্বীনের মা পরিচয়ে এক নারী আমাকে বিভিন্ন নম্বর থেকে ফোন দেয়। তারপর হতে জ্বীনের বাদশা নাজমুল ও সোহেল এবং অন্যদের মাধ্যমে আমার কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা নিতে থাকে। বিভিন্ন তারিখ ও সময়ে আমার নিকট হতে নগদ কয়েক কোটি টাকা প্রতারণা করে হাতিয়ে নেয়। পরবর্তীতে জ্বীনের বাদশা (রাসেল) আমাকে ফোন করে বলে সোহেল ও নাজমুলকে পাঠালাম তাদের কাছে ০৫ কোটি টাকা দিয়ে দে। যদি না দিস তাহলে তোর ক্ষতি হবে।
ভুক্তভোগী আজিজুল আলম তার প্রতারণার বিস্তারিত বিবরণে বলেন, ২০২৪ সালের ১৩ জুন আজিজুল আলমকে প্রতারক সোহেল, নাজমুল, কামাল, মিজান, রাজু, জামিল সহ ১০/১২ জন আজিজুলের উত্তরা অফিসে গিয়ে তাকে কিছু খাবার খাওয়ায়। আজিজুল আলম কিছুদিন পর বুঝতে পারেন তারা শয়তানের নিঃশ্বাস ও কালা জাদুর মাধ্যমে তাকে তাদের অধীনে নিয়ে গেছে। পরে তারা যা বলে আমি তাই করি। তাদের কথামত মেসার্স শফিক এন্টারপ্রাইজ নামক একাউন্টে ১৩/০৬/২০২৪ ইং তারিখে আরটিজিএসের এর মাধ্যমে এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ টাকা ও নগদ এক কোটি টাকা প্রদান করি। এছাড়াও বিভিন্ন তারিখে সর্বমোট পনেরো কোটি টাকা প্রতারকরা হাতিয়ে নেয়। প্রতারকরা পূনরায় আমার অফিসে এসে জ্বীনের কথা বলে এবং শয়তানের নিঃশ্বাসের মাধ্যমে আমাকে তাদের অধীনস্থ করে ফেলে। আমার অফিসের ভল্টের মধ্যে রক্ষিত আমার মা ও স্ত্রীর স্বর্ণের গহনা ২০০ (দুইশত) ভরি হাতিয়ে নিয়ে যায়। যার মূল্য ৫ কোটি টাকা।
তিনি আরও বলেন, ২৫/১০/২০২৫ইং তারিখে আমার ব্রাক ব্যাংক একাউন্ট হতে আসামী নাজমুল এর ব্রাক ব্যাংক একাউন্ট (২০৫৯৪৬৭৬২০০০) নম্বরে এক লক্ষ তেষট্টি হাজার টাকা পাঠাই। ২৭/১০/২৫ইং তারিখে দুই লক্ষ টাকা, ০১/১১/২৫ইং তারিখে একাত্তর হাজার টাকা, ১৯/১১/২৫ইং তারিখে এক লক্ষ টাকা এন হাসান গ্লোবাল ট্রেড কর্পোরেশন নামক একাউন্টে পাঠানো হয়। সর্বমোট বিশ কোটি পাঁচ লক্ষ চৌত্রিশ হাজার টাকা প্রতারণামূলকভাবে বিশ্বাসভঙ্গ করে তারা আত্মসাৎ করে। এরপর আমার নামে উত্তরখানের জমির দলিল নিয়ে মিরপুর ডিওএইচএস পল্লবীতে আমাকে যেতে বলে। দলিল না নিয়ে গেলে আমার বড় ধরনের ক্ষতি হবে বলে হুশিয়ার করে। তাদের কথামতো ১৫/০৫১২০২৫ ইং তারিখে সোহেল ফকিরের অফিসে গেলে আমকে মিষ্টি খাবার খেতে দেয়। উক্ত জমির বর্তমান বাজার মূল্য আনুমানিক ১৬ কোটি টাকা। যা প্রতারকরা আত্মসাৎ করেছে। তারা আমাকে প্রতিনিয়ত হুমকি প্রদান করে বলতো, "আমি যদি উক্ত বিষয়ে কাউকে বলি কিংবা পুলিশকে জানাই তাহলে আমাকে হত্যা করা হবে। আমি প্রাণভয়ে এই বিষয়ে কাউকে বলিনি এবং থানায় মামলা করতে যাইনি।
একটি ধূর্ত প্রতারকদের খপ্পরে পড়া আজিজুল আলম জাদুটোনার কার্যকারিতা শেষ হওয়ার পর সকল কিছু বুঝতে শুরু করে। তার স্মৃতিশক্তি ফিরে আসলে সে চিৎকার ও আর্তনাদ করে। তারপর আজিজুল আলম থানায় গিয়ে প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য মামলা দায়ের করেন।
প্রতারকরা একেকজন একেক রকম অভিনয় করে। কেউ বিক্রেতা, কেউ ক্রেতা, কেউ রাস্তায় ডিউটি করে। যেন প্রশাসনের লোকজন অফিসে না আসে। এটি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। তাদের কাছে মানুষকে বশ করানোর বিভিন্ন ধরনের মেডিসিন বা কথিত শয়তানের নিঃস্বাস, জাদু টোনা সর্বোপরি আগ্নেয়াস্ত্র আছে। মানুষকে ভয় দেখিয়ে অভিনব কায়দায় প্রতারণা করে তারা সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়।
পুলিশ সুত্রে জানা যায়, প্রতারক চক্র আজিজুল আলমের মত সহজসরল প্রতিষ্ঠিত আরো শত শত ব্যবসায়ীদেরকে টার্গেট করে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাত করেছে। এই সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র বহু প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিকে সর্বশান্ত করে ফেলেছে ম্যাগনেট পিলারের কথা বলে। উক্ত পিলারের দাম বিদেশে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা। এটাই তাদের প্রতারনার মূল হাতিয়ার। এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত আগামী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।
Shamiur Rahman

Please share your comment: