আবারও কাঁচাবাজারে অস্থিরতা, মরিচ-সবজি লাগামছাড়া!

Published: 14 July 2025 16:07

একদিকে টানা বৃষ্টিতে কৃষিজ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, অন্যদিকে পরিবহনেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফলে যোগান কমেছে, আর সে সুযোগে আড়ত পর্যায়ে দামও চড়েছে

রাজধানীর কাঁচাবাজার যেন আবারও অস্থির। গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিপাত, সরবরাহ সংকট ও পরিবহন ব্যাহত হওয়ার কারণে হঠাৎ করেই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাফিয়ে বেড়েছে।

কাঁচা মরিচ, বেগুন, করলা, ঢেঁড়সসহ প্রায় সব ধরনের শাক-সবজির দাম গত সপ্তাহের তুলনায় ৩০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর, যারা সীমিত আয় থেকে প্রতিদিনের বাজার খরচ চালিয়ে থাকেন।

আজ সোমবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁও, কাওরান বাজার, খিলগাঁও ও মোহাম্মদপুরের কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজি এবং কাঁচামালের দাম বেড়ে গেছে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত। এর মধ্যে কাঁচা মরিচের কেজি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, বেগুন ৮০ থেকে ৯০ টাকা, ঢেঁড়স ১০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। এমন চিত্রে ক্ষুব্ধ ও অসহায় হয়ে পড়েছেন সাধারণ ভোক্তারা।

বাজারে আসা একজন বেসরকারি চাকরিজীবী বলেন, "শুধু চাল আর ডাল কিনেই তো চলা যায় না। সবজির যে অবস্থা, মাঝারি পরিবারে রান্না করা এখন বিলাসিতা মনে হচ্ছে।"

অন্যদিকে, বিক্রেতারাও দাবি করছেন, আড়তে দাম বাড়ার কারণে তারাও বাধ্য হচ্ছেন খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করতে।

রাজধানীর তেজগাঁও, কাওরান বাজার, নিউমার্কেট, শান্তিনগর, মোহাম্মদপুর ও খিলগাঁও কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে প্রায় সব ধরনের শাক-সবজি ও কাঁচামালের দাম বাড়তি।

খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, একদিকে টানা বৃষ্টিতে কৃষিজ উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, অন্যদিকে পরিবহনেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফলে যোগান কমেছে, আর সে সুযোগে আড়ত পর্যায়ে দামও চড়েছে।

নজরুল ইসলাম নামে একজন বিক্রেতা বলেন, "আমরা নিজেরা ইচ্ছা করে দাম বাড়াই না। যেভাবে আড়ত থেকে দাম উঠছে, সেভাবেই বিক্রি করছি। ক্রেতারা রেগে যায়, কিন্তু আমাদের কিছু করার নেই।"

আজকের বাজারে যেসব পণ্যে দাম বেড়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য, কাঁচা মরিচ: ৩০০–৩৫০ টাকা কেজি, বেগুন: ৮০–৯০ টাকা কেজি, ঢেঁড়স: ৯০–১০০ টাকা কেজি, করলা: ৯০–১০০ টাকা কেজি, শসা ও বরবটি: ৭০–৮০ টাকাকেজি।

আলু ও পেঁয়াজ: স্থিতিশীল, তবে কিছু এলাকায় ৫–১০ টাকা বেশি। টমেটো ও পেপে: কেজিপ্রতি ১০–১৫ টাকা দাম বেড়েছে। তবে কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য যেমন চাল, ডাল, সয়াবিন তেল এবং ডিমের দাম এখনো তুলনামূলকভাবে স্থির রয়েছে।

ডিম বিক্রি হচ্ছে ১১০–১২০ টাকা ডজন দরে। ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০–১৯০ টাকা কেজি দরে। রুই, কাতলা মাছের দামও বেশি কিছুটা, তবে আগের তুলনায় অস্বাভাবিক নয়।

পাইকারি বাজারেও দাম বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। চালান কম আসায় প্রতিদিনই নতুন করে দর বাড়ানো হচ্ছে বলে জানান এক আড়তদার।

এদিকে বাজারে পণ্য কিনতে আসা সাধারণ মানুষের কণ্ঠে ঝরেছে ক্ষোভ আর হাহাকার। সুলতানা নামে একজন গার্মেন্টস কর্মী বলেন, “আয় বাড়েনি, অথচ বাজারে গেলে সব কিছুর দাম দ্বিগুণ। এখন বাজারে ঢোকার আগেই চিন্তা করতে হয় কী কিনব, কী রাখব।”

অন্যদিকে ভ্রাম্যমাণ হকার ও ফুটপাতের দোকানেও একই চিত্র সেখানে কিছু পুরনো পণ্য কিছুটা সস্তা হলেও, মান নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।

বর্তমান বাজার পরিস্থিতি আবারও প্রমাণ করছে, দেশে পণ্যের মূল্যনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনও অস্থিতিশীল এবং মৌসুমি চাপ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাজার দ্রুতই অসহনীয় হয়ে ওঠে।

সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর দায়িত্ব এখন শুধু সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নয়, বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। পাইকারি বাজারে মনিটরিং বাড়ানো, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো এবং ট্রাকসেল বা ন্যায্যমূল্যের বাজার সক্রিয় করাই হতে পারে এর কার্যকর সমাধান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর কাঁচাবাজার কেবল ঢাকাবাসীর খাদ্যচাহিদাই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ভোক্তা নিরাপত্তার একটি প্রতিচ্ছবি। এই বাজারে অস্থিরতা মানে সরাসরি মানুষের রান্নাঘরে আগুন। এমন অবস্থায় নীতি নির্ধারকদের আরও দায়িত্বশীল, সক্রিয় এবং জনদুর্ভোগকেন্দ্রিক পদক্ষেপ গ্রহণের সময় এসেছে।

Shamiur Rahman

Related