মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক: সংস্কারের নামে ঝুঁকিপূর্ণ পথ

Published: 13 January 2026 17:01

সামাজিকভাবে প্রোথিত মডেলই দেশে দারিদ্র্য হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে এবং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি গ্রহণযোগ্য দৃষ্টান্তে পরিণত করেছে

বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ খাত কোনো প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থা নয়। এটি গড়ে উঠেছে দীর্ঘ সামাজিক আন্দোলন, প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভাবন এবং এমন এক উন্নয়ন দর্শনের ভেতর দিয়ে; যেখানে ঋণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও নারীর ক্ষমতায়ন।

এই সামাজিকভাবে প্রোথিত মডেলই দেশে দারিদ্র্য হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে এবং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি গ্রহণযোগ্য দৃষ্টান্তে পরিণত করেছে।

এই বাস্তবতায় অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিভাগ ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর যে খসড়া ‘মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংক অধ্যাদেশ’ প্রকাশ করেছে, তা গভীর পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। সামাজিক উদ্ভাবনের নামে প্রস্তাবিত এই উদ্যোগ বাস্তবে বাংলাদেশের পরীক্ষিত ক্ষুদ্রঋণ কাঠামো থেকে একটি মৌলিক বিচ্যুতির ইঙ্গিত দেয়। নতুন ব্যাংক শ্রেণি সৃষ্টি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি জোরদার করবে—এমন কোনো শক্ত প্রমাণ নেই; বরং এতে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি।

প্রণয়ন প্রক্রিয়াটিও উদ্বেগজনক। মাত্র এক মাসের মধ্যে মতামত আহ্বান করা হয়েছে এমন একটি খাত নিয়ে, যেখানে প্রায় ৭০০ লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, চার কোটি ঋণগ্রহীতা পরিবার এবং পাঁচ লাখ কর্মীর জীবন-জীবিকা জড়িত। এ ধরনের অ-অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় নীতিনির্ধারণ করলে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা উপেক্ষিত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

বর্তমানে বাংলাদেশের ক্ষুদ্রঋণ খাতে প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে এবং সদস্যদের সঞ্চয় প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার। এই কাঠামো MFIs-কে স্বনির্ভর রেখেছে এবং উদ্বৃত্ত অর্থ সামাজিক কর্মসূচিতে বিনিয়োগের সুযোগ দিয়েছে। ব্যাংকসদৃশ কাঠামোয় রূপান্তর হলে এই ভারসাম্য নষ্ট হবে; মুনাফা ও আর্থিক সূচক সামাজিক লক্ষ্যকে ছাপিয়ে যাবে—যা ক্ষুদ্রঋণের মূল দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

ব্যাংক কোম্পানি আইনভিত্তিক কাঠামোর বহু ধারা এখনো উপনিবেশিক আমলের। এসব কাঠামোতে মূলধন পর্যাপ্ততা, মুনাফা ও নিয়ন্ত্রক সূচক অগ্রাধিকার পায়, কিন্তু কমিউনিটি-ভিত্তিক সামাজিক দায়বদ্ধতার স্থান সীমিত। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, ব্যাংকভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণ মডেলে ঋণের পরিমাণ বাড়লেও নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার কমে এবং সামাজিক কর্মসূচি সংকুচিত হয়।

প্রস্তাবিত অধ্যাদেশ বাস্তবায়িত হলে এনজিও খাতের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্বতন্ত্র পরিচালনা পর্ষদ ও নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণ দুর্বল হতে পারে; ফাউন্ডার এনজিওগুলোর নির্বাহী প্রধানদের ভূমিকা সীমিত বা অপসারিত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে। একই সঙ্গে সরকারি আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ ও নিয়ন্ত্রণমূলক প্রবণতা বাড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এছাড়া প্রস্তাবিত মাইক্রোক্রেডিট ব্যাংকগুলো পাবলিক ডিমান্ডস রিকভারি অ্যাক্ট অনুযায়ী আদায় ক্ষমতা ও জামানত গ্রহণের সুবিধা পেলে ছোট ও মাঝারি এনজিও MFIs প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পিছিয়ে পড়বে। এর ফলে খাতটি ধীরে ধীরে হোলসেল লেন্ডিং ব্যাংককেন্দ্রিক হয়ে উঠতে পারে এবং প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার সংকুচিত হবে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকেও প্রস্তাবটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। দেশে ইতিমধ্যে ৬২টি ব্যাংক রয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ব্যাংক পুনরুদ্ধারে সরকারের ব্যয় হয়েছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। উচ্চ খেলাপি ঋণের বাস্তবতায় নতুন ব্যাংক শ্রেণি যুক্ত করা আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উপরন্তু, ২০২৬–পরবর্তী মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের ফলে বিদেশি সহায়তা কমছে; এই সময়ে সামাজিক উদ্বৃত্তনির্ভর MFIs-কে ব্যাংক কাঠামোয় ঠেলে দেওয়া একটি বড় ঝুঁকি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, খসড়া অধ্যাদেশ ক্ষুদ্রঋণ খাতের মূল সমস্যাগুলো—ঋণগ্রহীতার পুনরাবৃত্তি, কর্মী অনিয়ম, খেলাপি ঋণ এবং ছোট MFIs-এর জন্য স্বল্পসুদে তহবিলের সীমাবদ্ধতা—সমাধান করে না। এমআরএ প্রবর্তিত তথ্যব্যবস্থা ও তদারকি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নই প্রকৃত সংস্কারের ভিত্তি হওয়া উচিত।

এই প্রেক্ষাপটে কোস্ট ফাউন্ডেশন, বিডি-সিএসও প্রসেস এবং ইক্যুইটিবিডি নেটওয়ার্কের সদস্যদের অভিমত স্পষ্ট: বাংলাদেশের প্রয়োজন আরও ব্যাংক নয়; প্রয়োজন বিদ্যমান ক্ষুদ্রঋণ কাঠামোকে শক্তিশালী করা, সুশাসন জোরদার করা এবং ক্ষুদ্রঋণের সামাজিক লক্ষ্য অক্ষুণ্ন রাখা। সংস্কার হোক—কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ পথে নয়।

Shamiur Rahman

Related