"যুদ্ধ দূর দেশে, ভোগান্তি নিজ দেশে"
ঝুঁকিতে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা
যুদ্ধের আগুন যতই দূরে জ্বলুক, তার ধোঁয়া মানুষের থালায় আসবেই—এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা
দূরের যুদ্ধ কখনোই সত্যিকার অর্থে দূরের থাকে না। জ্বালানি বাজার থেকে খাদ্য সরবরাহ—সবকিছুর মধ্য দিয়েই তার ঢেউ এসে লাগে মানুষের নিত্যজীবনে। বাংলাদেশের বাস্তবতাও তার ব্যতিক্রম নয়।
আজও দেশের বহু মানুষ সরকারের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির চাল বা খাদ্যসামগ্রী ব্যবহার করছে, যেগুলোর বস্তায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নাম মুদ্রিত রয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটলেও খাদ্য মজুত ও বিতরণ ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই দৃশ্য আমাদের চোখের সামনেই আছে।
এই বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়—খাদ্য নিরাপত্তা কেবল বর্তমানের নীতি নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির বিষয়।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা বা সম্ভাব্য যুদ্ধ বাংলাদেশের জন্য কেবল আন্তর্জাতিক রাজনীতির খবর নয়; বরং এটি কৃষি, খাদ্য সরবরাহ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বাস্তব উদ্বেগ।
জ্বালানির বাজারে ধাক্কা ও কৃষির ব্যয়
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব জ্বালানি বাজারের কেন্দ্রবিন্দু। যুদ্ধ বা অস্থিরতার দোলাচালে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি করতে পারে। বাংলাদেশের কৃষিতে সেচ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ এখনো ডিজেলচালিত। ফলে জ্বালানি খরচ বেড়ে গেলে কৃষি উৎপাদনের ব্যয়ও সরাসরি বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যের বাজারমূল্যে প্রভাব ফেলে।
সার ও কৃষি উপকরণের অনিশ্চয়তা
বিশ্বের বড় একটি অংশের সার উৎপাদন মধ্যপ্রাচ্য ও আশপাশের অঞ্চলে হয়। যুদ্ধ বা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে।
রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের উদাহরণ দেখিয়েছে, বৈশ্বিক সংঘাতে খাদ্য বাজার দ্রুত অস্থির হয়ে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়।
আমদানিনির্ভর খাদ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা
বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে অগ্রগতি করেছে, কিন্তু গম, ডাল, ভোজ্যতেলসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্য এখনও আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের অনেক দেশ খাদ্য নিরাপত্তাকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দিয়েছে—চীন বিশাল মজুত, সিঙ্গাপুর বৈচিত্র্যময় উৎস নীতি, সৌদি আরব বিদেশে কৃষি বিনিয়োগের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। এটি প্রমাণ করে, খাদ্য নিরাপত্তা কেবল কৃষি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কৌশল।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশে সৃষ্টি করতে পারে—কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি, সার ও কৃষি উপকরণের সরবরাহে অনিশ্চয়তা, খাদ্য আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক সরবরাহে বিঘ্ন, প্রবাসী আয়ের ওপর প্রভাব একসাথে ঘটলে এগুলো দেশের খাদ্য বাজার ও অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি করতে পারে।
প্রস্তুতি এখনই জরুরি
প্রথমত, খাদ্য মজুত ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমদানিনির্ভর খাদ্যপণ্যের স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, জ্বালানি নির্ভরতা কমাতে বিকল্প প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। চতুর্থত, খাদ্য ও সার আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করা উচিৎ। পঞ্চমত, কৃষি গবেষণা, সংরক্ষণ অবকাঠামো ও বাজার ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
শেষ কথা
আজকের বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা কেবল আর কৃষি খাতের বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তার অঙ্গ। যুদ্ধের আগুন যতই দূরে জ্বলে, তার ছোঁয়া আসে আমাদের থালায়।
বাংলাদেশের শক্তি মাপা হয় সীমান্তে নয়, বরং মাঠের ধান, খাদ্যভাণ্ডার এবং দূরদর্শী নীতির ক্ষমতায়। যারা আজকের প্রস্তুতি নেবে, তারাই আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্থিতিশীলতার রক্ষাকবচ হবেন। "আজকের প্রস্তুতিই হবে- আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তা।"
লেখক একজন উন্নয়ন কর্মী ও নীতি বিশ্লেষক
Shamiur Rahman

Please share your comment: