ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিরল নজির

সরকারি দলের এমপির মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ

Published: 02 April 2026 02:04

বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এই মুলতবি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক। এরপর স্পিকার এই প্রস্তাবের ওপর আলোচনার জন্য দিনক্ষণ নির্ধারণ করেন

বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে তৈরি হলো এক বিরল নজির। দীর্ঘ ৫৩ বছরের পথচলায় এই প্রথমবারের মতো ট্রেজারি বেঞ্চ বা সরকারি দলের কোনো সদস্যের আনা মুলতবি প্রস্তাব আলোচনার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এই মুলতবি প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক। এরপর স্পিকার এই প্রস্তাবের ওপর আলোচনার জন্য দিনক্ষণ নির্ধারণ করেন।

জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের ত্যাগ ও লড়াইয়ের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের ফসল এই ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। এটি আমাদের ভবিষ্যতের পথরেখা। আমি কার্যপ্রণালি বিধির ৬২ বিধি অনুযায়ী একটি মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করছি।

তিনি বলেন, এই সনদটি মূলত একটি রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল, যেখানে সংবিধান সংশোধনসহ বিভিন্ন আইন-কানুন প্রণয়ন, সংশোধন ও পরিমার্জনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা রয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর প্রকৃত বাস্তবায়ন পদ্ধতি কী হবে, সেবিষয়ে বর্তমান সংসদের কার্যক্রম মুলতবি রেখে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া অত্যন্ত জরুরি। আমি এই প্রস্তাবটি উত্থাপনের অনুমতি প্রার্থনা করছি।

স্পিকার প্রস্তাবটি গ্রহণ করে বলেন, ‘মাননীয় সদস্য, আপনার উত্থাপিত মুলতবি প্রস্তাবটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কার্যপ্রণালি বিধির ৬৫(২) বিধি অনুযায়ী আমি এটি আলোচনার অনুমতি দিচ্ছি। সংসদের বর্তমান কাজের অবস্থা বিবেচনা করে আগামী ৫ এপ্রিল রবিবার দিনের সর্বশেষ বিষয় হিসেবে এই প্রস্তাবের ওপর অনধিক দুই ঘণ্টা আলোচনার সময় নির্ধারণ করা হলো। ’

স্পিকার বলেন, ‘বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের ৫৩ বছরে এই প্রথম ট্রেজারি বেঞ্চের (সরকারি দল) কোনো সদস্য মুলতবি প্রস্তাব আনলেন। আমরা আগামী ৫ তারিখে এটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব। ’

মূলতবি প্রস্তাব হল সাম্প্রতিক, খুব জরুরি এবং জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে আলোচনার জন্য চলমান অধিবেশনের নির্ধারিত কার্যসূচি স্থগিত রাখার একটি সংসদীয় প্রস্তাব। এর মাধ্যমে জরুরি বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ ও বিতর্কের সুযোগ তৈরি হয়। এটি একটি বিরল সংসদীয় রীতি, যা দীর্ঘ বিরতির পর বা বিশেষ পরিস্থিতিতে উত্থাপন করা হয়।

উল্লেখ্য যে, জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা ঠিক করে দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়। আর সেসব সংস্কার প্রস্তাবের বাস্তবায়নের বিষয়ে জনগণের সম্মতি নিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন হয় গণভোট।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ অনুযায়ী, বর্তমান সংসদের সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও ভূমিকা রাখার কথা। সংসদের মতোই সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে পরিষদের প্রথম অধিবেশন ডাকার কথা।

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুসারে, নির্বাচনে জয়ী ব্যক্তিরা একই দিনে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি রেখেছিল সংসদ সচিবালয়। জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলের সদস্যরা সেদিন দুটি শপথ নিলেও বিএনপির এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। ফলে নির্ধারিত সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি।

রোববার বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান কার্যপ্রণালী-বিধির ৬২ বিধি অনুসারে জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপনের নোটিস দেন।

এছাড়া সোমবার স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার জন্য একটি মূলতবি প্রস্তাব আনেন। তবে সেই প্রস্তাবের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাব নিয়ে মঙ্গলবার সংসদে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ঐ প্রস্তাবে ‘প্রতিকার’ না পাওয়া এবং তাদের প্রস্তাব চাপা দিতে একই বিষয়ে আরেকটি মূলতবি প্রস্তাব আনার অভিযোগ তুলে বুধবার সংসদ থেকে ‘ওয়াক আউট’ করে বিরোধী দল।

Shamiur Rahman

Please share your comment:

Related