রাজবাড়ীতে পানির নীচে পেঁয়াজ
পেঁয়াজ চাষ করা কৃষি পরিবারগুলোতে এখন হতাশার চিহ্ন। এই পেঁয়াজে তাদের মধ্যে থাকে অনেক স্বপ্ন। অনেকেই ধার দেনা করে আবাদ করেছিলেন পেঁয়াজ। এখন সেই ধারের টাকা পরিশোধ করতে চিন্তার ভাজ পরেছে কপালে। ক্ষতি কমাতে সরকারের সহযোগীতা চান তা
রাজবাড়ী জেলা পিয়াঁজ উৎপাদনে সারা দেশের মধ্যে তৃতীয় অবস্থানে আছে। এবার ফলন ভাল হয়েছে। কৃষক স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলা তাদের উৎপাদন নিয়ে। অতিবৃষ্টি তাদের স্বপ্ন ডুবিয়ে দিয়েছে। চোখেন সামনে এখন শুধুই ধুসর আর অন্ধকার। তাদের গল্প শোনাছিলো, ভারতী, আকরাম সঞ্জিতরা। শুধু সঞ্জিত কুমার দাস নয় তার মত হাজারো কৃষকের সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে গত সপ্তাহের এক দিনের বৃষ্টিতে।
পেঁয়াজ চাষ করা কৃষি পরিবারগুলোতে এখন হতাশার চিহ্ন। এই পেঁয়াজে তাদের মধ্যে থাকে অনেক স্বপ্ন। অনেকেই ধার দেনা করে আবাদ করেছিলেন পেঁয়াজ। এখন সেই ধারের টাকা পরিশোধ করতে চিন্তার ভাজ পরেছে কপালে। ক্ষতি কমাতে সরকারের সহযোগীতা চান তারা।
“আমি সাত পাকি (২৪ শতাংশে ১ পাকি) জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করেছিলাম। আশা ছিল সাত পাকির পেঁয়াজ কমপক্ষে সাত লাখ টাকা বিক্রি করবো। এখন আমার সব পেঁয়াজ পানির নিচে। বেশির ভাগ পেঁয়াজ পঁচে গেছে। যেগুলো আছে কোন মতে তুলে বাজারে নিচ্ছি। কিন্তু বাজারে এই পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে না। এই পেঁয়াজ আমি এখন কি করবো। শ্রমিক নিয়ে যা তুলছি তাতে শ্রমিকের টাকাই হচ্ছে না। বৃষ্টিতে আমার সর্বনাশ করে দিয়ে গেছে।” কথাগুলো বলছিলেন রাজবাড়ী সদর উপজেলার চন্দনী ইউনিয়নের কৃষক সঞ্জিত কুমার দাস।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর জেলায় ৩৪ হাজার ৭৭৮ হেক্টর জমিতে হালি পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে বালিয়াকান্দি উপজেলায় ১১ হাজার ৬৩৭ হেক্টর জমিতে। এর পরই রয়েছে পাংশা উপজেলা। এই উপজেলায় ১০ হাজার ৬৬৭ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এছাড়া কালুখালী উপজেলায় ৮ হাজার ৬৪০ হেক্টর, সদর উপজেলায় ৩ হাজার ৪২৯ হেক্টর ও গোয়ালন্দ উপজেলায় ২ হাজার ৫৭৭ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে। এছাড়া জেলায় চলতি বছরে ৬ হাজার ১৩ হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ ও ১৪১ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ বীজ (কদম) আবাদ হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের সন্ধ্যার পর জেলার পাঁচটি উপজেলায়ই ঝড়ো ও শিলাবৃষ্টি হয়। তবে জেলার পাঁচটি উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয় সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলায়। বৃষ্টিতে জেলার মোট ১৩৮ হেক্টর জমির পেঁয়াজ পানির নিচে ডুবে যায়। এর মধ্যে সদর উপজেলাতেই ৮০ হেক্টর। পানির নিচে ডুবে ৫০ থেকে ৬০ হেক্টর জমির পেঁয়াজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সোমবার দুপুরে সদর উপজেলার চন্দনী ইউনিয়নের চন্দনী দক্ষিণ পাড়া মাঠে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের বেশিরভাগ পেঁয়াজের জমিতে পানি জমে আছে। পানি জমে থাকায় পেঁয়াজ পঁচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কৃষক পানির মধ্য থেকেই পেঁয়াজ তুলছেন। কেউ কেউ পেঁয়াজ তুলে উঁচু জমিতে রৌদ্রে শুকাতে দিয়েছে। কিছু জমিতে এখনও এক ফুটের বেশি উচ্চতায় পানি জমে আছে। অনেকে জমিতে পেঁয়াজ একেবারেই পঁচে গেছে। কয়েকজন নারী সেই জমি থেকে বেছে বেছে পেঁয়াজ তুলে নিচ্ছেন।
সঞ্জিত কুমার দাস বলেন, সাত পাকি জমিতে পেঁয়াজ রোপণ করতে তার আড়াই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বৃষ্টি না হলে কমপক্ষে সাত লাখ টাকার পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারতেন তিনি। এখন সব পেঁয়াজ পানির নিচে। পেঁয়াজ তোলা শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যাদেরকে পাওয়া যাচ্ছে তাদের দাম দিতে হচ্ছে ৮০০ টাকা করে। পানির মধ্য থেকে বাঁছাই করে পেঁয়াজ তুলতে হচ্ছে। এই পেঁয়াজ ঘরে সংরক্ষণ করার মত অবস্থা নেই। বাজারে বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। বাজারে একমণ পেঁয়াজ ৫০০ টাকার বেশি কেউ দাম বলে না। বৃষ্টিতে তার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।
ভারতী রাণী নামে এক নারী দুইজন শ্রমিক নিয়ে নিজের জমিতে পেঁয়াজ তুলছেন। তিনি বলেন, ৫ পাকি জমিতে তিনি হালি পেঁয়াজের আবাদ করেছিলেন। এতে তার প্রায় ২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। বৃষ্টির পরে জমিতে এক হাত উচ্চতায় পানি জমেছিল। এখন পানি কিছুটা কমেছে। কিন্তু জমির বেশিরভাগ পেঁয়াজ পঁচে গেছে। যেগুলো ভালো আছে সেগুলো তুলতে শ্রমিক পাওয়া যায় না। শ্রমিকদের সঙ্গে সন্ধ্যায় কথা বললে বলে সকালে আসবো, কিন্ত সকালে সে আর মাঠে আসে না। একজন শ্রমিকের দিনে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা দিয়েও কাজ করানো যাচ্ছে না। পেঁয়াজ নষ্ট হওয়ায় ব্যাপকভাবে আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানান তিনি।
সমিরন নামে এক নারী পেঁয়াজ তুলে রৌদ্রে শুকাতে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বৃষ্টিতে পেঁয়াজের জমিতে পানি জমে পেঁয়াজ নষ্ট হয়ে গেছে। জমির মালিকরা এই পেঁয়াজ তুলছে না। তারা নাকি আর তুলবে না। তাই আমি এসেছি তুলে নিতে। অল্প তুলেছি। বেশির ভাগই পঁচা। এরমধ্যে বেঁছে বেঁছে তুলে নিচ্ছি। আমরা গরীব মানুষ যে কয়টা পাই তাতেই আমাদের একটু আয়েশ হবে’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. শহিদুল ইসলাম বলেন, জেলার ১৩৮ হেক্টর পেঁয়াজের জমিতে পানি জমেছিল। ৫০ থেকে ৬০ হেক্টর জমির পেঁয়াজ আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা কৃষককে এগুলো তুলে দ্রুত বাজারে বিক্রি করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। বৃষ্টির বিষয়ে আমরা কৃষকেদের আগাম বার্তা দিয়েছিলাম। এবার বৃষ্টিটা একটু আগাম হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অন্য উপজেলার তুলনায় সদর উপজেলায় একটু ভারী বৃষ্টি হয়েছে। সদরের কিছু নিচু ধানী জমিতে এই বছর পেঁয়াজ আবাদ করা হয়েছিল। একারনে একটি বৃষ্টিতেই সেসব জমিতে পানি জমে গেছে। আমরা সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অগ্রধিকার ভিত্তিতে প্রণোদনার আওতায় আনা হবে।
Shamiur Rahman

Please share your comment: